বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
মহালছড়ি জোনের উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, ঔষধ ও ত্রাণ বিতরণ সেনাবাহিনী ১৬ বেঙ্গল’র উদ্যোগে দুর্গম এলাকায় শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা প্রদান খাগড়াছড়ি পৌরসভার ১৩৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা, নতুন কর নেই খাগড়াছড়িতে ১৭৬ বন্যাকবলিত পরিবার পেল নগদ সহায়তা ও স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী সাজেকে নিহত শিক্ষিকার পরিবারকে পাশে থাকার আশ্বাস বিজিবির বান্দরবানে সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলা শুরু, দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণে গুরুত্বারোপ পানছড়িতে বন্যাদুর্গত ১৫০ পরিবার পেল ত্রাণ সহায়তা খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষা শিক্ষা ক্লাবের উদ্বোধন রাঙ্গুনিয়ায় অসহায় ও অসুস্থ রোগীদের আর্থিক সহায়তা দিল প্রবাসী কর্ণফুলী ক্রীড়া পরিষদ আগাম প্রস্তুতিতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমেছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের ঘোষণা পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর ছয় মাসে বদলে গেল মহাপুরম উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের চিত্র বান্দরবানে শতাধিক বন্যাদুর্গত পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ উখিয়ায় বন্যাদুর্গত পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি, ৪৭৭ জনের চিকিৎসাসেবা বিলাইছড়ির ফারুয়ায় বন্যাদুর্গত আরও ৬০০ পরিবারকে ত্রাণ দেবে আশিকা পানছড়ি বাজারে নিষিদ্ধ পিরানহা বিক্রি, ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা

পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, শিল্প ও পর্যটনের সমন্বয়ে বদলে যেতে পারে লামার অর্থনীতির চিত্র

Reporter Name

মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি :

পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামা উপজেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ঘেরা জনপদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষি সম্ভাবনা, বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ এবং পর্যটনের এক অনন্য ভাণ্ডার। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা গুলোর একটি হিসেবে পরিচিত লামা দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার আলো ছড়ালেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণা ভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে লামা শুধু বান্দরবানের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এমন দেখা গেছে শুক্রবার (১২ জুন) সকালে অনুসন্ধানে।

 

স্থানীয় গবেষক কয়েকজন বলেন, “প্রকৃতি লামাকে যা দিয়েছে, তা দেশের খুব কম অঞ্চলই পেয়েছে। কৃষি, রাবার, পর্যটন, বনজ সম্পদ ও খনিজ সম্পদের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে লামা একদিন দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হবে।”রাবার রাজধানী হওয়ার সম্ভাবনা, স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, লামা উপজেলায় প্রায় ১,৫০০টির বেশি রাবার বাগান রয়েছে, যার অধিকাংশই বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত। গড়ে প্রতিটি বাগানের আয়তন প্রায় ২৫ একর। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় সাড়ে সাতশ ফলজ ও হর্টিকালচার বাগান।প্রতিবছর এসব বাগান থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা রাবার উৎপাদিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ রাবার ভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে অধিকাংশ রাবার কাঁচামাল হিসেবেই দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাঠানো হয়।

 

বাংলাদেশ রাবার গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক সদস্যদের মতে, লামায় রাবার প্রক্রিয়া জাতকরণ কারখানা, টায়ার উৎপাদন শিল্প, রাবার ভিত্তিক গৃহস্থালি সামগ্রী এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী শিল্প স্থাপন করা গেলে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।অর্থনীতিবিদদের মতে, কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে মূল্য সংযোজন ভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুগুণ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ,লামার পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে পাথর, বালু ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে উন্নতমানের নির্মাণযোগ্য পাথরের মজুদ রয়েছে।এছাড়া ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা এলাকার মিরিঞ্জা অঞ্চলে গ্যাসের সম্ভাবনা এবং রূপসীপাড়া এলাকায় কয়লার অস্তিত্ব নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে।

 

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ ছাড়া কোনো সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে সম্ভাব্য সম্পদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো গেলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হতে পারে।বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য ও পাহাড় সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মৎস্য উৎপাদনের নতুন দিগন্ত, পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি এবং প্রাকৃতিক জলধারার কারণে লামায় মৎস্য খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, দুই পাহাড়ের মাঝখানে ছোট-বড় জলাধার তৈরি করে বাণিজ্যিক মাছ চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

বর্তমানে দেশের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পার্বত্য অঞ্চলে বাণিজ্যিক মৎস্যচাষ এখনও পর্যাপ্ত বিকশিত হয়নি।মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি জলাধার ভিত্তিক মাছ চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে।কৃষির বহুমাত্রিক সম্ভাবনা, লামার কৃষি খাত এখন আর শুধু ধান কিংবা ঐতিহ্যবাহী ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উপজেলার পাহাড়ি মাটি এবং জলবায়ু নানা ধরনের অর্থকরী ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, আদা, হলুদ, আখ, ভুট্টা, কাসাভা, কফি, কমলা, পাম অয়েল এবং চা চাষের জন্য এ অঞ্চল বিশেষভাবে উপযোগী।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা পরীক্ষা মূলক ভাবে কফি ও কমলা চাষ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন। কৃষিবিদরা মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তা বৃদ্ধি করা গেলে লামা দেশের অন্যতম কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। বনজ সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ লামার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বাঁশ, বেত ও বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া বনজ সম্পদের ব্যবহার পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই টেকসই বন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে বাঁশ ও বেতভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাঁশ ভিত্তিক কাগজ শিল্প, আসবাবপত্র শিল্প, পরিবেশ বান্ধব নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদন এবং হস্তশিল্প খাতের উন্নয়ন হলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আয় উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে।তামাক চাষ: সম্ভাবনা ও বিতর্ক লামা উপজেলায় রবি মৌসুমে ব্যাপক পরিমাণ তামাক চাষ হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষকদের বড় একটি অংশ এ ফসলের ওপর নির্ভরশীল।কৃষকদের দাবি, তামাক চাষে তুলনামূলক দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়া যায়। ফলে অনেক কৃষক অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে তামাক চাষে আগ্রহী হন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তামাক চাষের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, তামাকের পাশাপাশি বিকল্প অর্থকরী ফসলের বাজার ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা জরুরি।পর্যটনের অপার সম্ভাবনা লামার সবচেয়ে বড় সম্পদ গুলোর একটি হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং নৈসর্গিক পরিবেশ পর্যটকদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

বর্তমানে মিরিঞ্জা পর্যটন এলাকার, মহামুনি বৌদ্ধ বিহার, কোয়ান্টাম শিশু কানন এবং মাতামুহুরী নদীর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটকদের আগমন বাড়লে আবাসন, পরিবহন, হস্তশিল্প, খাদ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত ব্যাপকভাবে লাভবান হবে।লামা পৌরসভার জনপ্রতিনিধি বলেন, “সরকার যদি আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, তাহলে লামা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে।শিল্পায়নের পথে প্রধান বাধা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, লামার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিল্প অবকাঠামোর অভাব। উৎপাদিত কৃষিপণ্য, ফল, রাবার ও বনজ সম্পদের অধিকাংশই কাঁচামাল হিসেবে অন্যত্র চলে যায়।

ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হয় না এবং বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থান সীমিত থাকে।ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, একটি শিল্পপার্ক, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং রাবার শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা গেলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যেতে পারে।স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, লামার উন্নয়নের জন্য সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।তাদের মতে, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই শিল্পায়ন ও সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

ভবিষ্যতের লামায়, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিন্ন মত হলো,লামা উপজেলায় কৃষি, শিল্প, পর্যটন, বনজ সম্পদ ও খনিজ সম্পদের যে সমন্বিত সম্ভাবনা রয়েছে, তা বাংলাদেশের অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মী। যথাযথ পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, গবেষণা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে লামা আগামী দশকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই সম্ভাবনার পাহাড় একদিন জাতীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এমন প্রত্যাশাই স্থানীয় জনগণের গবেষক ও উন্নয়নকর্মীরা এমন জানান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *