সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বিলাইছড়ি প্রতিনিধি।।
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক পরিবারের স্যানিটারি ল্যাট্রিন। পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় দেড় হাজার পরিবার স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এসব পরিবারের অন্তত ৬ হাজার মানুষকে খোলা জায়গা কিংবা অস্থায়ী ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে হচ্ছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় চর্মরোগের সমস্যাও দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সরেজমিনে ফারুয়া ইউনিয়নের তারাছড়ি, যমুনাছড়ি, ফারুয়া বাজার, গোয়াইনছড়ি, ওরাছড়ি, তক্তানালা, উলুছড়ি, চাইন্দা, রোয়াপাড়া, ফুঁছড়া, লতাপাহাড় ও আলেচংসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে অনেক পরিবারের টয়লেট ভেসে গেছে বা মাটি ও পলির নিচে চাপা পড়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অনেক পরিবার সামান্য গর্ত খুঁড়ে চারপাশে বাঁশ ও কাপড় দিয়ে অস্থায়ীভাবে প্রয়োজন সারছে। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে জঙ্গল বা খোলা জায়গা ব্যবহার করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সাধারণ স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণে রিং, স্ল্যাব, টিন, বাঁশ ও শ্রমিকসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। বন্যায় ঘরবাড়ি ও জমিজমার ক্ষতি হওয়ায় অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে নতুন টয়লেট নির্মাণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কার্বারী ভরত চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বন্যায় এলাকার ক্ষয়ক্ষতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন বা নিরাপদ টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
তিনি বলেন, “দরিদ্র পরিবারগুলো হঠাৎ করে কীভাবে নতুন টয়লেট নির্মাণ করবে? এ ক্ষেত্রে সরকার, দাতাগোষ্ঠী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।”
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ৪৪৭ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৭০০ পরিবারের টয়লেট ভেসে গেছে, মাটির নিচে চাপা পড়েছে অথবা পলি জমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “কিছু পরিবার নিজ উদ্যোগে টয়লেট মেরামত বা নির্মাণ করলেও আর্থিক ও অন্যান্য সমস্যার কারণে অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। ইউনিয়নে জনসংখ্যার তুলনায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়।”
বিলাইছড়ি সদর ইউনিয়নের ডাউনপাড়া, মালুম্যা, তিনকুনিয়া, সাক্রাছড়ি, ধুপশীল, মাইতকাবাছড়া, কুতুবদিয়া, দীঘলছড়ি, ডেবামাথা, হাজাছড়াপাড়া, দুপ্যাচর, শালবাগান, আমতলা, রাজধনছড়া ও গাছকাটাছড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
দীঘলছড়ি ডেবামাথা হাজাছড়াপাড়ার বাসিন্দা শান্তিলাল চাকমা বলেন, তাঁর গ্রামে প্রায় ৫০ পরিবারের মধ্যে ৪৫ পরিবারেরই বর্তমানে নিরাপদ টয়লেট ব্যবস্থা নেই।
বিলাইছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি দেওয়ান জানান, তাঁর ইউনিয়নে ২৫০টির বেশি পরিবারের টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা বর্ষার পানি জমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে কেংড়াছড়ি ইউনিয়নের কেরনছড়ি, শামুকছড়ি, বাঙালকাটা, ভালাছড়ি, নাড়াইছড়ি, হিজাছড়িসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ টয়লেটের সংকট রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শান্তি বরন তালুকদার জানান, ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৮০০ পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ পরিবারের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা জরুরি।
তবে বড়থলি ইউনিয়নে তুলনামূলকভাবে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা।
সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, বন্যার কারণে দুর্গম এলাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে রিং, স্ল্যাব ও টিন সরবরাহ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো জরুরি।”
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিলাইছড়ি উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা আকাশ চন্দ্র বর্মন জানান, উপজেলায় বর্তমানে চারটি গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। আরও কয়েকটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ২০০ পরিবারের জন্য স্যানিটারি ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, “অবশিষ্ট চাহিদার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুরজিত দত্ত বলেন, পয়োনিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকলে পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করবে।
তিনি বলেন, “প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম ফকির বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য, যোগাযোগ ও স্যানিটেশন সমস্যার বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছেন। রিংওয়েল, গভীর নলকূপ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে থাকা বিলাইছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে এখন খাদ্য ও আশ্রয়ের পাশাপাশি নিরাপদ পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা অন্যতম জরুরি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হলে এসব এলাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ সাজু মিয়া, চৌধুরী বোডিং, আদালত সড়ক, খাগড়াছড়ি সদর, খাগড়াছড়ি।
মোবাইল: 01737443344, 01557273434, ই-মেইল: newsalokitopahar@gmail.com
www.alokitopahar.com