দেবদত্ত মুৎসুদ্দী রাঙামাটি প্রতিনিধি
আসন্ন শুভ প্রবারণা পূর্ণিমাকে ঘিরে রাঙামাটির বৌদ্ধ বিহারগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পাহাড়ের বৌদ্ধ পল্লীগুলোতে এখন ধর্মীয় উৎসবের আমেজ। ভিক্ষুদের বর্ষাবাস সমাপন ও দায়ক-দায়িকাদের চীবর দানের মহৎ পুণ্যকে সামনে রেখে রাঙামাটির রাজবন বিহারসহ প্রতিটি বিহারকে সাজানো হচ্ছে নতুন রূপে।
বৌদ্ধ ধর্মে প্রবারণা পূর্ণিমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাবাস যাপন করেন। এ সময় তারা বিহারে অবস্থান করে ধ্যান, প্রার্থনা ও ধর্মীয় শিক্ষা চর্চা করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমায় অর্থাৎ প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ভিক্ষুদের এই বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে।
এদিন ভিক্ষুরা তাদের ভুল-ত্রুটির জন্য একে অপরের কাছে প্রবারণা বা আত্মসমর্পণ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যাতে সামনের দিনগুলোতে আরও শুদ্ধভাবে ধর্ম পালন করতে পারেন। এ কারণেই এর নাম প্রবারণা পূর্ণিমা।
এই পূর্ণিমার পরদিন থেকে শুরু হয় এক মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসব, যা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। কথিত আছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড় বুনে চীবর তৈরি করে ভিক্ষুদের দান করলে অশেষ পুণ্য লাভ হয়।
রাঙামাটির প্রধান ধর্মীয় তীর্থস্থান, রাজ বন বিহার, বুদ্ধাংকুর বৌদ্ধ বিহার, মৈত্রী বিহার সহ সকল বৌদ্ধ বিহারে প্রবারণাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বিহার প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলোকসজ্জা, ফুল দিয়ে সাজসজ্জা এবং ফানুস তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভক্তরা।
রাজবন বিহারের আবাসিক ভিক্ষু সূত্রে জানা গেছে, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে ভোর থেকে বুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল গ্রহণ, ভিক্ষু সংঘের পিণ্ডদান, ধর্মীয় দেশনা ও ফানুস ওড়ানোর আয়োজন থাকবে।
এছাড়া রাঙামাটি শহরের মৈত্রী বিহার, আনন্দ বিহার, কাপ্তাইয়ের চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার, বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকলের প্রতিটি বিহারেও চলছে একই প্রস্তুতি।
প্রবারণা উপলক্ষে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পাহাড়ে সম্প্রীতির মিলনমেলাও বসে। দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো বৌদ্ধ নর-নারী বিহারে এসে সমবেত হন। সন্ধ্যায় হাজারো রঙিন ফানুস আকাশে উড়িয়ে তারা প্রার্থনা করেন বিশ্ব শান্তি ও মানব কল্যাণের জন্য। আকাশে উড়ন্ত ফানুস কাপ্তাই হ্রদের জলে প্রতিফলিত হয়ে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
রাজবন বিহারে আসা এক পূণ্যার্থী বলেন, "প্রবারণা আমাদের আত্মশুদ্ধির উৎসব। তিন মাস পর ভিক্ষুরা যখন প্রবারণা করেন, আমরাও আমাদের মনের কালিমা দূর করার শপথ নিই। এর জন্য সারা বছর অপেক্ষা করি।"
স্থানীয় বৌদ্ধ নেতারা জানান, পাহাড়ের সাম্প্রতিক সাজেকের অস্থিরতার মধ্যেও প্রবারণা উৎসবকে ঘিরে মানুষের মাঝে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিহারগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আগামী রবিবার ( ২৫ অক্টোবর) পূর্ণিমা তিথিতে রাঙামাটির আকাশ হাজারো ফানুসের আলোয় আলোকিত হবে, আর বুদ্ধের বাণী "জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক" ধ্বনিতে মুখরিত হবে পাহাড়ের প্রতিটি বিহার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ সাজু মিয়া, চৌধুরী বোডিং, আদালত সড়ক, খাগড়াছড়ি সদর, খাগড়াছড়ি।
মোবাইল: 01737443344, 01557273434, ই-মেইল: newsalokitopahar@gmail.com
www.alokitopahar.com