মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি।।
বান্দরবানের লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র শয্যা সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সোমবার (২৪ আগস্ট) ৯২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। নির্ধারিত শয্যার অতিরিক্ত রোগীদের অনেককেই মেঝে ও করিডোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ইউনিট পরিচালিত হওয়ায় হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি প্রায় এক বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ থাকায় গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সোমবার সকালে সরেজমিনে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝেতে বিছানা পেতে রোগীদের রাখা হয়েছে। কোথাও করিডোরের পাশে রোগী শুয়ে আছেন, আবার কোথাও রোগীদের সঙ্গে স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এতে রোগীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের স্বাভাবিক চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট সেখানে মোট ৯২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৫ জন এবং নারী ৫৭ জন। হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ৫০টি। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্যফলকেও বিভিন্ন সময়ে শয্যা ব্যবহারের হার ১০০ শতাংশের বেশি থাকার তথ্য পাওয়া যায়। কোনো কোনো মাসে এই হার ১২০ থেকে ১৫০ শতাংশের ওপরে উঠেছে এবং এক পর্যায়ে প্রায় ১৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ইউনিট পরিচালনা করা হচ্ছে। ২৪ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০ জন এবং হাম আক্রান্ত ১০ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ ছাড়া ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরাও ভর্তি রয়েছেন।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় গুরুতর রোগীদের বান্দরবান, চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজারের উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ থাকায় রোগীর স্বজনদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অন্য যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে জরুরি রোগী পরিবহনে সময়ের পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা নাদিম বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর জন্য জেলা সিভিল সার্জন, জেলা পরিষদ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো নতুন অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য আমরা জেলা সিভিল সার্জন, জেলা পরিষদ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছি না।”
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সোলায়মান আহমেদ বলেন, “শয্যা সংকটে রোগীদের সেবা দেওয়া খুবই কঠিন। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী বেশি থাকায় চিকিৎসা দিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শয্যার সংকট থাকায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে রাখতে হচ্ছে।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর আগে হাসপাতালের দুটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সই বিকল হয়ে পড়া এবং মেরামতের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছিল। নতুন অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জেলা পরিষদকেও লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ৫০ শয্যার হাসপাতালে নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হলে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তাদের দাবি, রোগীর বর্তমান চাপ বিবেচনায় লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে অন্তত ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা অ্যাম্বুলেন্স সেবা দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জরুরি রোগী স্থানান্তরের সুবিধার্থে নতুন অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটিতে শয্যা সংকট ও অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতার কারণে রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীদের স্বজনরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ সাজু মিয়া, চৌধুরী বোডিং, আদালত সড়ক, খাগড়াছড়ি সদর, খাগড়াছড়ি।
মোবাইল: 01737443344, 01557273434, ই-মেইল: newsalokitopahar@gmail.com
www.alokitopahar.com