খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় পাহাড়ি ও অনাবাদি জমিকে কাজে লাগিয়ে ভুট্টা চাষে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। উঁচুনিচু ও ঢালু জমিতে পরিকল্পিত চাষাবাদ এবং আধুনিক জাত ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বাড়ছে, পাশাপাশি কৃষকের আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে—এমন তথ্য দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উপজেলায় ৫৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৫১ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছর ২০২৫–২৬-এ আবাদি জমি কমে ৫০ হেক্টরে নেমে এলেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪১০ মেট্রিক টন। জমির পরিমাণ কিছুটা কমলেও ফলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
‘কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারকরণ’ প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর মাটিরাঙ্গা কার্যালয় বিএম-৫১৮ (হাইব্রিড) জাতের ভুট্টার চারটি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেছে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে ৩৩ শতক জমিতে চাষ করা হয়েছে। মাটিরাঙ্গা পৌরসভা ব্লকের নতুন পাড়া, বেলছড়িসহ চারটি ব্লকে এসব প্রদর্শনীতে আধুনিক চাষপদ্ধতি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমন কৌশল হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ভুট্টা চাষে জমি প্রস্তুত, আগাছা দমন, সার প্রয়োগ ও সময়মতো বপনে নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। প্রতি কানি জমিতে গড়ে প্রায় ১৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যার মধ্যে বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও পরিচর্যার খরচ অন্তর্ভুক্ত। কৃষকদের মতে, সঠিক সময়ে সার ও সেচ নিশ্চিত করা গেলে ফলন ভালো হয় এবং বাজারদর অনুকূলে থাকলে একই জমি থেকে উল্লেখযোগ্য আয় সম্ভব।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বিএম-৫১৮ (হাইব্রিড) জাতটি উচ্চ ফলনশীল, দানা গঠন ভালো এবং আবহাওয়া সহনশীল। গাছের গঠন শক্ত ও মজবুত, উচ্চতা সাধারণত ১০৫–১১৫ সেন্টিমিটার, জীবনকাল ১৪০–১৪৫ দিন এবং সম্ভাব্য ফলন হেক্টরপ্রতি ১৩–১৪ মেট্রিক টন। পাহাড়ি মাটিতে উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত বীজ ব্যবহারের ফলে প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
গড়গড়িয়া এলাকার কৃষকরা জানান, এই জাতের গাছ ঝড়-বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম হেলে পড়ে এবং রোগবালাইও কম দেখা যায়। দানাগুলো মোটা ও ভরাট হওয়ায় স্থানীয় বাজারে চাহিদা ভালো, যা কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহ জোগাচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে ভুট্টা একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। সঠিক সময়ে বপন, সুষম সার প্রয়োগ ও নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, অনুকূল আবহাওয়া ও নির্দেশনা অনুসরণ করা গেলে আগামী মৌসুমগুলোতে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ভুট্টা এখন কেবল পশুখাদ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। তবে দেশের প্রধান খাদ্য ধানকে গুরুত্ব দিয়ে ধান্য জমিতে ভুট্টা আবাদ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পাহাড়ের ঢালে সোনালি ভুট্টার শীষ মাটিরাঙ্গায় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষকের সচেতন প্রচেষ্টায় পাহাড়ি জমিতে ভুট্টা চাষ ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ও আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ সাজু মিয়া, চৌধুরী বোডিং, আদালত সড়ক, খাগড়াছড়ি সদর, খাগড়াছড়ি।
মোবাইল: 01737443344, 01557273434, ই-মেইল: newsalokitopahar@gmail.com
www.alokitopahar.com