খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার পাহাড়ি ঢালগুলো এখন সোনালি হলুদে ছেয়ে গেছে। দিগন্তজোড়া মাঠে হাজার হাজার সূর্যমুখী ফুল মাথা উঁচু করে দোল খাচ্ছে, যা কেবল প্রকৃতিপ্রেমীদের নয়, স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও নতুন আশা জাগাচ্ছে।
সূর্যমুখী ফুলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি সূর্যের দিকে মুখ করে ঘোরে, যা ‘হেলিওট্রপিজম’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে কচি সূর্যমুখী গাছে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়, ফলে গাছ সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে বৃদ্ধি ও বীজ গঠনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মাটিরাঙ্গার কামিনী মেম্বার পাড়ার বাসিন্দা যশোদা রাণি জেলার জলবায়ু সহনশীল (করলিয়া) প্রকল্পের একজন নারী উদ্যোক্তা। আগে তিনি ধান চাষ করতেন, তবে এবার ব্যক্তিগত শখ ও লাভের হিসাব মিলিয়ে সূর্যমুখী চাষ বেছে নিয়েছেন। এক বিঘা জমিতে তিনি ১০ হাজার টাকা খরচ করে ৮ু১০ মণ ফলনের আশা করছেন। তিনি বলেন, “বড় আকারের ফুল হলে মাত্র পাঁচটি ফুল থেকে প্রায় এক কেজি বীজ পাওয়া যায়। বাজারমূল্য ঠিক থাকলে এতে ধানের তুলনায় লাভ অনেক বেশি।”
উপজেলার কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৩৫ জন কৃষক টাটা কোম্পানির হাইব্রিড টিএসএফ-২৭৫ জাতের সূর্যমুখী বীজ ও প্রয়োজনীয় সার সহায়তা পেয়েছেন। তাইন্দং ইউনিয়নের বটতলী এলাকার কৃষক সোহেল মিয়া এবার ৫ বিঘা জমিতে এই জাতের সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি জানান, “ধানের তুলনায় এতে সেচ ও রোগবালাই অনেক কম। ফলন আশানুরূপ হলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা আছে।”
মাটিরাঙ্গার হলদে বাগিচাগুলো এখন স্থানীয়দের জন্য বিনোদনের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ছবি ও সেলফি তুলতে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ায় বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এলাকাটি পর্যটন দিক থেকেও পরিচিতি পাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে কাজ করা কৃষি কর্মকর্তারা পাহাড়ি এলাকায় সূর্যমুখী চাষকে লাভজনক ও স্বল্পমেয়াদি ফসল হিসেবে দেখছেন। তাইন্দং ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “কৃষক সোহেল মিয়া ৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড সূর্যমুখী চাষ করেছেন। আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি, আশা করছি এবার ভাল ফলন হবে।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. সেলিম রানা বলেন, “এখানকার মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। উৎপাদিত তেল সুগন্ধি ও সুস্বাদু।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ আশা প্রকাশ করেন, “পাহাড়ি অঞ্চলে বিকল্প ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছি। এটি স্থানীয়ভাবে ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
এক সময় যেসব পাহাড়ি জমি বড় সময় ধরে পড়ে থাকত, এখন সেখানে দোল খাচ্ছে সোনালী সূর্যমুখী। যথাযথ বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা থাকলে এই ‘সূর্যমুখীর হাসি’ ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি পাহাড়ি কৃষকের ঘরে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ সাজু মিয়া, চৌধুরী বোডিং, আদালত সড়ক, খাগড়াছড়ি সদর, খাগড়াছড়ি।
মোবাইল: 01737443344, 01557273434, ই-মেইল: newsalokitopahar@gmail.com
www.alokitopahar.com