
পপেন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি:
চৈত্রের হালকা গরমে বসন্তের শেষ রঙ যখন পাহাড়ে মিশে যায়, তখন শুরু হয় পাহাড়ি আদিবাসীদের বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু, বিষু, বিহু, সাংক্রান, চাক্রান ও পাতা উৎসবের আবহ। যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর কাছে এই উৎসব কেবল আনন্দের নয়, বরং ঐতিহ্যের, আত্মপরিচয়ের আর সহাবস্থানের এক গভীর ভাষা। কিন্তু এতদিন পাহাড়ের এই উৎসবের মানচিত্রে যে অপূর্ণতা ছিল, এবার তা পূরণ হতে চলেছে।
সমতলের ৬১ জেলায় বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের যে ঢেউ প্রতি বছর বয়ে যায়, তার ছোঁয়া খাগড়াছড়িতে আগে তেমনভাবে লাগেনি। পাহাড়িদের উৎসবের রঙ থাকলেও বাঙালির নববর্ষের সার্বজনীন আমেজ ছিল প্রায় পুরোটাই অনুপস্থিত। এবার সেই অনুপস্থিতির অবসান ঘটতে চলেছে।
প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখ উদযাপন
খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়ার উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় আগামী ১৪ এপ্রিল সোমবার প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হতে যাচ্ছে। সকাল আটটায় খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এই আয়োজনের সূচনা হবে। থাকছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই আয়োজনে পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মিলনমেলা ঘটবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।
এবারের আয়োজনে বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজুর রঙের সঙ্গে মিশে যাবে বাঙালির বর্ষবরণের উচ্ছ্বাস। পাহাড়ি ঢোলের তালে ধ্বনিত হবে বাঙালির একতারা। একই মঞ্চে, একই আকাশের নিচে বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্যের এক অপূর্ব উদযাপনের প্রত্যাশায় রয়েছেন আয়োজকরা।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলো প্রতি বছর চৈত্রের শেষ দিনগুলোতে এবং বৈশাখের শুরুতে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব পালন করে। চাকমারা পালন করে বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু এবং চাক সম্প্রদায় পালন করে চাক্রান উৎসব। এতদিন পাহাড়ে বাঙালিদের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের কোনো উল্লেখযোগ্য আয়োজন ছিল না।
এই উদ্যোগকে স্থানীয়রা শুধু একটি উৎসবের সংযোজন হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে দেখছেন দুই সম্প্রদায়ের হৃদয়ের সংযোগ, পারস্পরিক সংস্কৃতির সম্মান এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার দৃঢ় পদক্ষেপ হিসেবে। পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে খাগড়াছড়ির সকল মানুষকে এই উৎসবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।