
শীতের রিক্ততা পেরিয়ে প্রকৃতিতে বসন্তের আগমন জানান দিচ্ছে আমের মুকুলের মৌ মৌ গন্ধ। ভোরের কুয়াশা সরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় উঁকি দিচ্ছে সোনালি আভায় মোড়া আম্রকুঞ্জ। সবুজ পাহাড়ের ক্যানভাসে মুকুলের এই সমারোহ শুধু ঋতুচক্রের স্বাভাবিক রূপান্তর নয়—এটি পাহাড়ি অর্থনীতির জন্যও এক ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রাঙ্গামাটির পাহাড়ি বাগানগুলোতে এবার সময়ের আগেই আমের মুকুল এসেছে। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় আম্রপালি ও রাংগুয়াই জাতের পাশাপাশি বিদেশি জাত কাটিমন এবং উচ্চমূল্যের মিয়াজাকি আমের গাছেও মুকুলের প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সম্ভাব্য বাম্পার ফলনের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
জুম চাষনির্ভর পাহাড়ি অর্থনীতিতে গত এক দশকে আম চাষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অনেক প্রান্তিক কৃষক ধীরে ধীরে জুমের পাশাপাশি স্থায়ী ফল বাগানের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে আমের মুকুল মানেই কেবল একটি মৌসুমি দৃশ্য নয়, বরং পাহাড়ি জনপদের আর্থিক স্থিতিশীলতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত।
রাঙ্গামাটির বড়াদম এলাকার বাগান মালিক সমরেশ চাকমা ও মোহনলাল চাকমা জানান, এবছর শীতের তীব্রতা তুলনামূলক কম থাকায় মুকুল দ্রুত ও সমানভাবে এসেছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ফলনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।
তবে আশার পাশাপাশি কিছু শঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে ভোরের দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা আমের মুকুলে ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন চাষিরা। এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, কুয়াশাজনিত ফাঙ্গাস সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত ছত্রাকনাশক স্প্রে ও বাগানের পরিচর্যায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রাঙ্গামাটিতে প্রায় ৩ হাজার ৬ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
সব মিলিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় দুলতে থাকা এই মুকুল কেবল ফলনের পূর্বাভাসই নয়—এটি পাহাড়ি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, স্থায়িত্ব ও আশার নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠছে।