
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ি আবারও জাতীয় রাজনীতির আলোচনায়। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদে নির্বাচন মানেই শুধু প্রার্থী আর প্রতীকের লড়াই নয়—এখানে ভোট মানে পাহাড় ডিঙানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা, ব্যয়বহুল যাতায়াত এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করে ভোটাধিকার প্রয়োগ।
আগামীকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) খাগড়াছড়ি-২৯৮ সংসদীয় আসনের ২০৩টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে গত (১০ ফেব্রুয়ারি) শেষ হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণা। তবে প্রচারণা শেষ হলেও ভোটারদের দুশ্চিন্তা শেষ হয়নি।
খাগড়াছড়ির দুর্গম বাস্তবতায় ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব ভোটারদের জন্য অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অনেক ভোটারকে কেন্দ্রে পৌঁছাতে হেঁটে যেতে হয় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার, সময় লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।বিশেষ করে দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকার ভোটারদের কাছে ভোট দেওয়া হয়ে উঠেছে কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ।
খাগড়াছড়ি সদরের সাতভাইয়াপাড়া এলাকার দিনমজুর চাইহ্লাউ মারমার পরিবারের সাতজন ভোটার ভোট দিতে গেলে যাতায়াত খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা—যা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। ফলে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। এমন চিত্র শুধু একটি গ্রামের নয়। জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই একই বাস্তবতা বিরাজ করছে।
নির্বাচন কমিশনে পাঠানো পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি আসনের ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। সবচেয়ে বেশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায়। এসব কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার-ভিডিপির সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অতি দুর্গম তিনটি কেন্দ্রে হেলিকপ্টারে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে—যা একদিকে প্রশাসনিক প্রস্তুতির দৃশ্যপট তুলে ধরলেও অন্যদিকে পাহাড়ি ভোট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে কেন্দ্র বিন্যাস করা হলে ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নাগরিক সমাজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক বোধিসত্ত্ব দেওয়ান বলেন,“সমতলের মতো করে পাহাড়ে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হলে ভোটার অনাগ্রহ বাড়বেই। পাহাড়ি জনবসতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, জীবনযাত্রার বাস্তবতা আলাদা—এটা না বুঝলে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা কঠিন।”
অনেক বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষ ভোটের আগের দিনই কেন্দ্রের আশপাশে এসে থাকতে না পারলে ভোট দিতে পারেন না—এমন বাস্তবতাও রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কখনও জয়ী হতে পারেননি। জাতীয় দলের মনোনীত প্রার্থীই বরাবর বিজয়ী।
এবার মাঠে রয়েছেন ১১ জন প্রার্থী, যার মধ্যে দু’জন স্বতন্ত্র প্রার্থী—ঘোড়া ও ফুটবল প্রতীকে—পাহাড়ি ভোটারদের মধ্যে আলোচনায়। তবে পাহাড়ি ভোট বিভক্ত থাকায় শেষ পর্যন্ত সুবিধা নিতে পারে জাতীয় দল, বিশেষ করে বিএনপি।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে— পাহাড়ি ভোটের বড় অংশ বিভক্ত থাকলে জাতীয় দল আবারও এগিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, এই নির্বাচনের চাবিকাঠি পাহাড়ি ভোটের ঐক্য—যা এখনও অনিশ্চিত।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। খাগড়াছড়ির ২০৩টি কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার ৬৩৯ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।
তবে ভোটারদের প্রশ্ন—ভোটাধিকার প্রয়োগের পথ যদি এতটাই দুর্গম হয়, তাহলে নিরাপত্তা আর প্রস্তুতি কতটা ফলপ্রসূ হবে?
খাগড়াছড়ির নির্বাচন শুধু ব্যালটের হিসাব নয়—এটি পাহাড়, পথ ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পরীক্ষা।আগামীকাল ভোটের দিন দেখিয়ে দেবে—
পাহাড় ডিঙিয়ে কতজন ভোটার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন, আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ কতটা প্রতিফলিত হয় জাতীয় রাজনীতিতে।
খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের ফলাফল শুধু একজন সংসদ সদস্য নয়, পাহাড়ে গণতন্ত্রের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরবে।