
দেবদত্ত মুৎসুদ্দী, রাঙ্গামাটি।।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ জলরাশি, পাহাড়ি কৃষি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। দেশের আয়তনে বৃহত্তম এই জেলার পর্যটন, মৎস্য, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প খাতে রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, গবেষণা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এসব খাত স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
প্রায় ৬ হাজার ১১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাঙামাটির অর্থনীতিতে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কাপ্তাই হ্রদ, শুভলং ঝরনা, রাজবন বিহার, ঝুলন্ত সেতু, ফুরোমন পাহাড়সহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি সাজেক ভ্যালিকেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রমও বৃহত্তর পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
সংশ্লিষ্ট খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে ইকো-ট্যুরিজম, হাউজবোট, কায়াকিং, স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন এবং হোম-স্টে ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিরাপদ নৌপরিবহন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত পর্যটন গাইড এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে স্থানীয় উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
কাপ্তাই হ্রদ রাঙামাটির মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান উৎস। এ হ্রদকে কেন্দ্র করে মৎস্য আহরণ, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ, খাঁচায় মাছ উৎপাদন, সংরক্ষণাগার ও হিমাগার স্থাপন এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এ খাতের অর্থনৈতিক অবদান বাড়ানো সম্ভব।
এ জন্য হ্রদের পানির গুণগত মান রক্ষা, মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে মৎস্যজীবীরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকায় আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফলের চাষ হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাজুবাদাম ও কফি চাষ নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। এসব কৃষিপণ্য স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে উৎপাদিত ফলের একটি বড় অংশ সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে ফল সংরক্ষণাগার, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন, জুস ও জ্যাম তৈরির কারখানা এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত জাতের চারা, কৃষি প্রশিক্ষণ ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়লে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, মূল্য সংযোজন হবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষক সমবায় ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর পাশাপাশি কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, কারিগরি সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জলজ জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন, নৌচলাচল ও হ্রদের পানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পের সক্ষমতা ও উপযোগিতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
রাঙামাটির বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র, কোমর তাঁতে বোনা কাপড়, বাঁশ-বেতের পণ্য ও হস্তশিল্প স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব পণ্যের নকশা, গুণগত মান ও ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ, আধুনিক বিপণনব্যবস্থা, পণ্যের মান উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও ই-কমার্সের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা, সহজ ঋণ এবং বাজারসংযোগের সুযোগ দেওয়া গেলে তাঁদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে।
রাঙামাটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, পণ্য পরিবহনের ব্যয়, ভূমি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত জটিলতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, কাপ্তাই হ্রদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ, মৎস্য খাতে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত, ভূমি অধিকার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।
রাঙামাটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপরও নির্ভর করছে। যথাযথ গবেষণা, বাস্তবসম্মত নীতিমালা ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে রাঙামাটি পার্বত্য অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।