
মো.জয়নাল আবেদীন, আলীকদম।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যতিক্রমী উদ্যোগে আলীকদমে “প্রাথমিক চিকিৎসা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ-২০২৬” সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জনকল্যাণমুখী এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠান রোববার (১৯ এপ্রিল) বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় সুশৃঙ্খল ও উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি সেনাবাহিনীর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়নের নির্দেশনায় আলীকদম জোনের উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
প্রশিক্ষণে আলীকদম উপজেলার ২২টি পাড়া থেকে আগত মোট ২৬ জন অংশগ্রহণকারী-যার মধ্যে ৯ জন নারী ও ১৭ জন পুরুষ-অত্যন্ত আগ্রহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে অংশ নেন। শেখার প্রতি তাদের আন্তরিকতা ও বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ পুরো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসূ। প্রশিক্ষণে আলীকদম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি সেনা জোনের মেডিকেল অফিসাররা প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে বিভিন্ন জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল -দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, ভাঙা অঙ্গের পরিচর্যা, অচেতন রোগীর ব্যবস্থাপনা, অগ্নিদগ্ধদের সেবা, সাপের কামড়ে করণীয় এবং পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার পরবর্তী চিকিৎসা। বাস্তবধর্মী অনুশীলনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীরা এসব গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা আত্মস্থ করেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক।
তিনি বলেন, “মানবিক সহায়তা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঙ্গীকার। এ ধরনের প্রশিক্ষণ মানুষকে শুধু সচেতনই করে না, বরং জরুরি মুহূর্তে জীবন রক্ষায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করে।”
তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের অর্জিত জ্ঞান নিজ নিজ এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে জনসেবায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মনজুর ইসলাম, স্থানীয় চিকিৎসকবৃন্দ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সমাপনী পর্বে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদপত্র, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী এবং একটি করে ফার্স্ট এইড ব্যাগ বিতরণ করা হয়।
এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দুর্গম এলাকায় যেখানে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাওয়া কঠিন, সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থানীয় ব্যক্তিরা জরুরি মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিভিন্ন পাড়ায় ক্ষুদ্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আলীকদম জোন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবান রিজিয়নের নির্দেশনায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের আস্থা ও ভরসাকে আরও সুদৃঢ় করেছে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছে।