
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এবারও বিভিন্ন জাতের শিম চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। গত বছরের মতো এবারও ফারুয়া নৌ-পথে যাতায়াতের সময় রাইংখ্যং খালের দুই ধারে নিজ ও পতিত জমিতে শত শত একর জায়গাজুড়ে শিমের সবুজ সমারোহ চোখে পড়ে। শিমের পাশাপাশি বাদাম ও অন্যান্য সবজির চাষও হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এতে পাহাড়ি এই জনপদে সৃষ্টি হয়েছে এক নীরব কৃষি বিপ্লব।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফারুয়া ইউনিয়নের চাইন্দা, উলুছড়ি, তক্তানালা, গো-ছড়া, চ-ছড়ি, ফু-ছড়া, রোয়াপাড়া ছড়া, আমকাটাছড়া, ওরাছড়ি, আবইমারা, যামুছড়া, লিত্তিছড়ি, গোয়াইনছড়ি, এগুজ্যাছড়ি, তারাছড়ি, যমুনা ছড়ি ও শুক্কুরছড়ি এলাকার প্রায় প্রতিটি আবাদযোগ্য জমিতেই শিম চাষ হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় বিলাইছড়ি ইউনিয়নেও এ চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে শীতকালীন গিল শিম। কৃষকেরা বাঁশের খুঁটির সঙ্গে লতা বেঁধে ঝোপাকারে শিমের আবাদ করছেন, যেখানে একেকটি ঝোঁপে ধরছে প্রচুর শিম।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। রোগ-বালাই না ধরলে গত বছরের মতো ভালো ফলন ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশাবাদী তারা। অধিকাংশ কৃষক বাজার থেকে বীজ না কিনে নিজ জমির ভালো বীজ সংগ্রহ করে পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করেন। প্রয়োজনে কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ দমনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এগুজ্যাছড়ি এলাকার কৃষক জীবন তঞ্চঙ্গ্যা জানান, শিমের বীজ অন্য ফসলের তুলনায় আগে সংগ্রহ করা যায় এবং তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। সহজে পচে না যাওয়ায় এখানকার কৃষকেরা এই চাষে বেশি আগ্রহী হয়েছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এখন শহর থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি এলাকায় এসে শিম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আগে তামাক চাষ করতাম। উপজেলা কৃষি অফিস ও এনজিওগুলোর পরামর্শে কয়েক বছর ধরে শিম ও সবজি চাষ করছি। এতে আমরা লাভবান হচ্ছি।”
৩ নম্বর ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রায় ২০ বছর আগে এ অঞ্চলজুড়ে ছিল নলখাগড়ার আধিপত্য। পরে তামাক কোম্পানির হাত ধরে তামাক চাষ শুরু হয়। তামাক নিরুৎসাহিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে শিম ও সবজি চাষের দিকে ঝুঁকেছেন কৃষকেরা। বর্তমানে শিমই এই এলাকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত সড়ক থাকায় পরিবহন ও বাজারজাত করাও তুলনামূলক সহজ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় গিল শিম প্রায় ৭৮ হেক্টর, চিনাবাদাম ৬৫ হেক্টর, বিভিন্ন সবজি ২২৬ হেক্টর ও ফরাস শিম ৩০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের জনবল সংকট থাকলেও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। কোনো সমস্যা হলে কৃষকেরা যোগাযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
সম্প্রতি ফারুয়া ইউনিয়ন পরিদর্শন শেষে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজেশ প্রসাদ রায় বলেন, পাহাড়ে একসময় কৃষি বলতে শুধু তামাক চাষ বোঝাত। এখন সেই ধারণা বদলে গেছে। শিম ও বাদাম চাষ পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তিনি সেগুন গাছের পরিবর্তে ফলজ, বনজ ও শাকসবজি চাষে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে কৃষির এই সাফল্য সমতলের কৃষিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকেরা বলছেন, নিয়মিত পরামর্শ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো হলে এই কৃষি বিপ্লব আরও বিস্তৃত হবে।