
মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি।।
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট ছিল নিত্যদিনের সমস্যা। কোথাও এক থেকে তিন কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে, আবার কোথাও শত শত ফুট নিচে নেমে ঝিরি, ছড়া কিংবা ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো স্থানীয় বাসিন্দাদের। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তেন নারী ও শিশুরা।
তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বিভিন্ন উদ্যোগে দুর্গম এলাকাগুলোর সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। গভীর নলকূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং) স্থাপনের মাধ্যমে এসব এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর ফলে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের পানির সংকট অনেকটাই কমেছে।
বান্দরবান সদর উপজেলার টিএনটি মারমাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির কাছের কল থেকে পানি সংগ্রহ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ৬০ বছর বয়সী মাচিং মারমা বলেন, ‘এক বছর আগেও পানি সংগ্রহের জন্য প্রায় ৮০০ ফুট নিচে পাহাড়ি পথে যেতে হতো। এখন বাড়ির কাছেই পানি পাওয়া যায়। এতে আমাদের কষ্ট অনেকটাই কমেছে।’
পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা বলেন, তাদের এলাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল পানির সংকট। বর্তমানে গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবার পানি সুবিধা পাচ্ছে।
বান্দরবানের মেঘলা এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও কনক চাকমা জানান, আগে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এখন গভীর নলকূপের মাধ্যমে দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ১২টি পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, ১০টি নতুন জিএফএস, ৫৮৩টি রিংওয়েল, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, ৫০টি গভীর নলকূপ ও ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্গম এলাকায় জিএফএস, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, গভীর নলকূপ ও পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এতে অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কয়েকটি স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি থাকলেও প্রকল্পের মূল কার্যক্রম শেষ হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহের ফলে পানির সংকট কমার পাশাপাশি নারী ও শিশুদের পানি সংগ্রহে ব্যয় হওয়া সময় ও শ্রমও সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ পানির ব্যবহারের সুযোগ বাড়ায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।