সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
সাজেকে পর্যটকবাহী গাড়ি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, ফিরে যাওয়ার নির্দেশ রাঙামাটিতে দুর্গাপূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, ৪৭ মণ্ডপে তিন স্তরের নিরাপত্তা রাজস্থলীতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে হস্ত ও কুঠির শিল্পের বিকাশে দুই সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণের উদ্বোধন ৪৮ ঘণ্টার জন্য শিথিল সাজেকের সড়ক অবরোধ: ফিরছেন শত শত পর্যটক থানচিতে ইয়াবা সহ আটক এক বান্দরবান সেনানিবাসে তিন সপ্তাহব্যাপী ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ কাপ্তাই তথ্য অফিসের আয়োজনে ফ্যামিলি সমাবেশ অনুষ্ঠিত বান্দরবানে পাহাড়ে পর্যটক বরণে প্রস্তুত প্রতিটি উপজেলায় খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার- ওয়াদুদ ভূইয়া এমপি রাঙামাটিতে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা: শহরের বেহাল সড়ক সংস্কারে জোর তাগিদ দীঘিনালা জোনের উদ্যোগে দুর্গম পাহাড়ে দুই শতাধিক মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা বাঘাইছড়িতে মুসলিম ব্লক দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসার দ্বিবার্ষিক কমিটি গঠন পানছড়ি উপজেলায় পাহাড়ের বুক চিরে খাল ভরাট, ২০ হাজার টাকা জরিমানা রাঙামাটিতে ক্যাবের নতুন কমিটি: সভাপতি মোহাম্মদ আলী, সম্পাদক হিমেল চাকমা শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মাদক ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধের লক্ষ্যে বান্দরবানে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযান ফারুয়ার ডেবাছড়ায় বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে — ইউএনও অভি দাশ

সংকট, সম্ভাবনা ও স্বনির্ভরতার তাগিদ: গার্মেন্টস খাতের ভবিষ্যৎ কোন পথে? মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

Reporter Name

বাংলাদেশের অর্থনীতি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাখ লাখ শ্রমিকের ঘামে ভেজা মুখ আর কারখানার বেল্টে ঘুরে চলা রঙিন সুতোর বুনন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ, জাতীয় প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনের মূল ড্রাইভার হিসেবে কাজ করছে আমাদের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত। জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া এই খাতকে ঘিরে আবর্তিত হয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পরিবর্তনের চাকা। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—যে খাতটি বছরের পর বছর ধরে দেশের অর্থনীতির ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি কি আজ নিজেই বহুমুখী সংকটের ঘূর্ণাবর্তে বন্দি?

বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি—এই চারমুখী চাপে বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প। সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিক মন্দা এবং ইউরোপ-আমেরিকার প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বেশ কড়া প্রতিযোগিতার ছায়া পড়েছে। একদিকে পশ্চিমা বাজারগুলোতে কাঙ্ক্ষিত চাহিদার হ্রাস, অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজার দখল ও দাম কমানোর তীব্র প্রতিযোগিতা বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মার্জিন সংকুচিত করে তুলছে। রাশিয়ার ওপর চলমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সে দেশের চাহিদাপূর্ণ বাজারটিতেও আমাদের রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

তবে বাইরের ঝড়ের চেয়ে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত ও নীতিগত বাধাগুলো গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিকদের বেশি ভোগাচ্ছে। বর্তমানে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট উৎপাদনের চাকা স্থবির করে দিচ্ছে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং ডাইং কারখানাগুলো জ্বালানির স্বাভাবিক চাপ না পাওয়ায় সময়মতো ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এক চরম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কাপড়ের ‘ইউনিট প্রাইজ’ বাড়াচ্ছেন না, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গড় মূল্যের চেয়ে তা কম অফার করা হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ইটিপি ও সবুজ কারখানার তদারকি খরচ বৃদ্ধি, সর্বোপরি উৎপাদন খরচের ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি মালিক পক্ষকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের (SME) কারখানাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে একে একে গুটিয়ে যাচ্ছে।

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও এই খাতের প্রধান শক্তি হচ্ছে এর অভিযোজন ক্ষমতা (Resilience) এবং কাঠামোগত সক্ষমতা। সমস্ত অনিশ্চয়তার মেঘ ভেদ করে ইতিবাচক যে দিকটি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তা হলো পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনে বাংলাদেশের বিশ্বজোড়া সুনাম। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লিড (LEED) সার্টিফাইড গ্রিন বা সবুজ কারখানার মালিক বাংলাদেশ। বৈশ্বিক ক্রেতারা যখন ইএসজি (ESG) কমপ্লায়েন্স ও পরিবেশসম্মত উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা এগিয়ে গিয়ে সেই আস্থার জায়গাটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, ঐতিহ্যবাহী মৌলিক বা সাধারণ পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন ম্যান-মেইড ফাইবার (MMF), স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশনেবল পোশাক তৈরির দিকে মন দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা এ দেশের টেক্সটাইল খাতে উচ্চমূল্য সংযোজনে বড় সম্ভাবনা দেখছেন, যা আমাদের সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তব টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আমাদের খোলস ছেড়ে বের হতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের একক প্রচেষ্টায় এ বিশাল শিল্প রক্ষা করা সম্ভব নয়।

প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প কারখানা সচল না থাকলে সার্বিক জাতীয় আয় থমকে যাবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া রপ্তানির সঠিক সময়সূচি (Lead Time) বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য জরুরি ভিত্তিতে এনার্জি মিক্স ও বিকল্প উপায়ে গ্যাস আমদানির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দ্রুততম সময়ে বাজারের বৈচিত্র্যায়ন বা Market Diversification করতে হবে। এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নির্ভরশীল না থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নতুন নতুন উদীয়মান বাজারে মনোযোগ দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি (GCC) ভুক্ত দেশগুলোতে এবং পার্শ্ববর্তী এশীয় অঞ্চলে বাজার সম্প্রসারণের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

তৃতীয়ত, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। এখনো কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম ফাইবার বা সুতার জন্য আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কাঁচামালে আত্মনির্ভরশীলতা না এলে বৈশ্বিক বাজার মূল্যের ওঠানামার ধাক্কা আমাদের সইতেই হবে।

চতুর্থত, শিল্পখাতে অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা গ্রহণ করছে, তখন আমাদের কারখানাগুলোতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে অপচয় কমাতে হবে এবং দক্ষতা বা Productivity বাড়াতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন যেন কোনোভাবেই লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের রুটি-রুজির ওপর আঘাত না হানে; বরং তাদের দক্ষতা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মশালা গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি, গার্মেন্টস শিল্পের সাফল্য কেবল কারখানা মালিকদের মূলধনে সীমাবদ্ধ নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে ৪০ লাখ শ্রমিকের ঘাম এবং তাঁদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পরিশ্রম। শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক, কারখানার সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত মজুরি এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে ইন্ডাস্ট্রি স্ট্রাকচার ভেঙে পড়বে। মালিকদের যেমন টিকে থাকার সুযোগ দিতে হবে, তেমনি অর্থনৈতিক কষাঘাত থেকে শ্রমিক সমাজকেও সুরক্ষা দিতে হবে।

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামারী ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এ খাত যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা সহজ কোনো পথ অতিক্রম করে আসেনি। তবে বর্তমানের সংকটগুলোকে যদি আমরা সঠিক সময়ে সমাধান করতে না পারি, তবে দীর্ঘকালের অর্জিত সাফল্য হাতছাড়া হতে সময় লাগবে না। সরকার, ব্যাংক, উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক—সবার সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপই পারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে সংকট থেকে মুক্ত করে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে। জাতীয় স্বার্থেই আজ গার্মেন্টস খাতকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

E-mail: msislam.sumon@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *