
দহেন বিকাশ ত্রিপুরা, স্টাফ রিপোর্টার।।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, ভূমি সমস্যা সমাধান, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির বিশিষ্টজনেরা।
মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) বিকেলে খাগড়াছড়ি শিশু একাডেমি মিলনায়তনে জেলা বিএনপির আয়োজনে খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞার সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসব দাবি ও মতামত উঠে আসে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠায় সকল পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, “আমি একা শান্তি চাইলে হবে না, সবাইকে শান্তি চাইতে হবে।” পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার সরকারের সঙ্গে আরও বেশি সংলাপ ও যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অন্যতম কারণ ভূমি সমস্যা। ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তাই ভূমি কমিশনকে কার্যকর করে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
বক্তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী যেকোনো ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। তারা বলেন, পাহাড়ের সমস্যা রাজনৈতিক; তাই সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
সভায় শহর এলাকায় ইউপিডিএফ, জেএসএস ও অন্যান্য সংগঠনের নামে কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান কয়েকজন বক্তা। পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদক ও অনলাইন জুয়ার আসক্তি থেকে রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের অসমাপ্ত নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানানো হয়।
মতবিনিময় সভায় পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং সেবার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, পাহাড়ে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনায় হেডম্যান ও কার্বারীরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু তাদের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানী ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তারা সম্মানী ভাতা নিয়মিত প্রদান এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানান। সিএইচটি নারী হেডম্যান-কার্বারী নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে একটি নিজস্ব ভবন নির্মাণের দাবিও উত্থাপন করা হয়।
সভায় বক্তব্য দেন খাগড়াছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সুধীন কুমার চাকমা, সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক বোধিসত্ত্ব দেওয়ান, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রবীণ চন্দ্র চাকমা, বাংলাদেশ মারমা উন্নয়ন সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী, বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরা, বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি ম্রাসাথোয়াই মারমা, খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের নেতা আবদুল মজিদ, সমাজকর্মী ধীমান খীসা, সমাজকর্মী রবি শংকর তালুকদার, সনাতন সমাজ কল্যাণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নির্মল কান্তি দাশ, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি আশা প্রিয় ত্রিপুরা, পেরাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিম্বীসার খীসা এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তমাল তরুণ দাশসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
সভা শেষে জেলার উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরামর্শক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা এতে সম্মতি জানান।