
মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি।।
বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের (রিজার্ভ ফরেস্ট) শত শত একর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি ভূ-দখলদার চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৌশলে বনভূমি দখল করে সেখানে ফলজ বাগান, তামাক চাষ, বাণিজ্যিক খামার ও রিসোর্টসহ নানা স্থাপনা গড়ে তুলছে। এ কাজে বন বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকার কথা জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনভূমি দখলের ক্ষেত্রে প্রথমে জুম চাষ, ফলজ বাগান কিংবা সামাজিক বনায়নের নামে পাহাড়ি জমি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ওই জমির গাছপালা কেটে বা বিভিন্ন উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে পাহাড়ের ঢাল সমতল করা হয়। কোথাও কোথাও বনভূমি দখল করে তামাক চাষের জন্য চুল্লি, বাণিজ্যিক খামার ও পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
লামার ফাইতং ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ে সরকারি বনভূমি দখল ও কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের দাবি, ভুয়া স্ট্যাম্প ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারি জমির মালিকানা দেখিয়ে এসব জমি হস্তান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও ভূমির মালিকানা নিয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ দখল ও বন উজাড়ের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও দখলের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অর্থ নেওয়া ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
বন উজাড় ও পাহাড় কাটার কারণে লামা ও আলীকদমের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের ফলে প্রাকৃতিক ঝিরি-ছড়ার পানিপ্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বর্ষাকালে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল চিহ্নিতকরণ এবং বনভূমি উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্র ও ভূমির রেকর্ড যাচাই করে দখল হওয়া বনভূমি চিহ্নিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দখলের সঙ্গে সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বন উজাড় বা বনাঞ্চল দখলের বিষয়ে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে একাধিক সংবাদকর্মীর মাধ্যমে সরকারি বনাঞ্চল দখলের অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে সত্যতা যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি প্রশাসনের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে সরকারি বনভূমি দখলের প্রকৃত চিত্র এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা স্পষ্ট হবে।