
হাবীবুল্লাহ মিসবাহ, রাজস্থলী প্রতিনিধি।।
রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রশাসনিক তদারকি ও দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য সম্প্রতি ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও অফিসে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি নেই। ফলে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৯ সালে আবুল কালাম আজাদ নামে একজন মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাজস্থলীতে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বদলির পর থেকে এ পদে আর কোনো কর্মকর্তাকে পূর্ণকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এর আগে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজারের দায়িত্বে ছিলেন বিভীষণ চাকমা। তাঁর সময়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অথবা কাপ্তাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দেওয়া হতো বলে তিনি জানান।
বিভীষণ চাকমা বলেন, তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় রাজস্থলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিংবা কাপ্তাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতেন। ২০১৯ সালে একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও তিনি বদলি হওয়ার পর পদটি আবার শূন্য হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ সাল থেকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে নতুন করে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বা পদায়ন হয়নি। বর্তমানে একজনকে অতিরিক্ত একাডেমিক সুপারভাইজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে দাপ্তরিক কার্যক্রম, বিদ্যালয় পরিদর্শন, প্রশাসনিক তদারকি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়সহ বিভিন্ন কাজে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজস্থলী উপজেলায় এমপিওভুক্ত, নন-এমপিও ও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট ছয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের জেলা শিক্ষা অফিস কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এদিকে উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষার সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় রাজস্থলী উপজেলার পাসের হার ৩০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৩৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। চলতি বছর কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। শিক্ষার ফলাফল কমে যাওয়ার পেছনে শিক্ষক-অভিভাবকদের সমন্বয়ের ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা এবং পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাবকে বিভিন্ন পক্ষ দায়ী করছে। তবে দীর্ঘদিন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা না থাকায় নিয়মিত তদারকির ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনের সময় সঠিক নির্দেশনা পেতে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হচ্ছে।
রাজস্থলী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ হাসান বলেন, শুধু রাজস্থলী নয়, পুরো রাঙামাটি জেলাতেই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সংকট রয়েছে। তিনি নিজেই বর্তমানে চারটি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নিয়োগ বা পদায়ন না হওয়ায় উপজেলা পর্যায়ে দিনের পর দিন এ ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলে সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রশাসনিক ও একাডেমিক তদারকির জন্য স্থায়ী কর্মকর্তা থাকা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে পদটি শূন্য থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই রাজস্থলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে দ্রুত কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ বা পদায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।