
দিদারুল হৃদয়, গুইমারা প্রতিনিধি।।
খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার জালিয়াপাড়ায় অবস্থিত ইসলামিক মিশনের প্রধান মুনমুন সুলতানার বিরুদ্ধে রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণ, চিকিৎসাসেবায় অনিয়ম, কর্মচারী ও স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং দীর্ঘদিনের একটি চলাচলের রাস্তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানে স্বামী-স্ত্রীর চাকরি এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মুনমুন সুলতানাকে ওই দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, ইসলামিক মিশনে চিকিৎসাসেবা নিতে গেলে মুনমুন সুলতানাকে ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন না করলে তিনি রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পায়ের সমস্যা। চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনি মুনমুন সুলতানাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান করেন বলে অভিযোগ করেন লুৎফর রহমান। তাঁর ভাষ্য, ‘ম্যাডাম’ না বলায় এমন আচরণের পর তিনি আর মিশনে চিকিৎসা নিতে যাননি।
অপর বাসিন্দা রহিমা অভিযোগ করেন, মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনি মুনমুন সুলতানাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি বলে তাঁর দাবি।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসা নিতে গিয়ে নির্ধারিত একটি সরকারি টিকিটের পরিবর্তে একাধিক টিকিট কিনতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে। মিশনের কর্মচারীদের সঙ্গেও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা।
ইসলামিক মিশনের নিজস্ব জায়গায় ১৯৮৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গুচ্ছগ্রাম স্থাপনের পর থেকে সেখানকার বাসিন্দারা একটি রাস্তা চলাচলের জন্য ব্যবহার করে আসছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের ভাষ্য, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে ব্যবহৃত ওই রাস্তা সম্প্রতি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জানান, রাস্তা বন্ধের জন্য শ্রমিক দিয়ে কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ করা হলে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়বে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
এ ছাড়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের রোপণ করা কলাবাগান কাটাসহ বিভিন্ন ঘটনায় মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এসব অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা।
ইসলামিক মিশনের প্রধান মুনমুন সুলতানা ও তাঁর স্বামী একই সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, মুনমুন সুলতানার স্বামী ইসলামিক মিশনের মাটিরাঙ্গা ও লক্ষীছড়ি কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন। তবে তিনি নিয়মিত অফিস করেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
স্বামী-স্ত্রীর একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি এবং একই এলাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি ও কর্মস্থলসংক্রান্ত বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয় কয়েকজন আলেমের সঙ্গেও ইসলামিক মিশনের প্রধানের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় মাওলানা ফারুকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অতীতে মুনমুন সুলতানা নিজেকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাগ্নি পরিচয় দিয়ে স্থানীয় কয়েকজন আলেমকে অপমান-অপদস্থ করেছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সাক্ষী রয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইসলামিক মিশনের মতো একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে রোগী, কর্মচারী, স্থানীয় বাসিন্দা ও আলেম-ওলামাদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশিত।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামিক মিশনের প্রধান মুনমুন সুলতানা বলেন, ‘আমরা সরকারি কর্মকর্তা, নিউজের ধার ধারি না।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগগুলো আগেই ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি এসব বিষয়ে আর বক্তব্য দিতে চান না বলেও জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পারমিশন ছাড়া বক্তব্য দিতে পারব না। আপনারা অভিযোগমূলে নিউজ করেন, সমস্যা নাই।’
অন্যদিকে গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিশকাতুল তামান্নার কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের চলাচলের রাস্তা উন্মুক্ত রাখা, সাধারণ মানুষকে হয়রানি বন্ধ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। দাবি বাস্তবায়ন না হলে মানববন্ধন ও স্মারকলিপিসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।