
মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি।।
পাহাড়ি দুর্গম পথ। প্রতিদিন প্রায় চার কিলোমিটার হাঁটতে হয়। বিদ্যালয়ে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান শেষে আবার সেই পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরা। এর বিনিময়ে মাস শেষে কখনো ৫০০ টাকা, কখনো ১ হাজার টাকা পান অথোয়ই মারমা। নিজের সংসার চালাতেই যেখানে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে ছুটে যান তিনি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম বনপুর রাজাপাড়ায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন অথোয়ই মারমা। ২০২৩ সাল থেকে বনপুর সাংগু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পাঠদান করেন। এরপর আবার প্রায় চার কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরেন।
অথোয়ই মারমা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ত্রিশড্রেবা পাড়ার বাসিন্দা। তাঁর বাবা ক্যচিং মারমা ও মা চোছা মারমা। পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁর শিক্ষাজীবনেও প্রভাব ফেলেছিল। রামতুইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তাঁকে কুমিল্লার জ্যোতিঃপাল মহাথের বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। সেখানেই তাঁর শিক্ষাজীবনের বড় একটি সময় কাটে।
দারিদ্র্যরে মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৯ এবং ডুলাহাজারা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ২.৩৩ অর্জন করেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতায় রাবার বাগানে গাছ কাটার কাজ ও কৃষিকাজও করেছেন।
নিজের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতাই যেন শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে আরও গভীর করেছে। অথোয়ই বলেন, তাঁর এলাকায় পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। এ কারণে দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। একসময় তাঁর বাবা তাঁকে আর পড়াশোনা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন তিনি বাবাকে বলেছিলেন, পড়াশোনা না করলে জীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে; তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে চান।
বর্তমানে নিজেই আর্থিক সংকটে থাকলেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন অথোয়ই। তাঁর ভাষায়, এলাকার অনেক মানুষ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করেন। সেই বাস্তবতা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই শিক্ষার্থীরা যেন সুযোগের অভাবে পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে তিনি তাদের উৎসাহ দেন।
অথোয়ই মারমা বলেন, ‘সংসার চালাতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। মাস শেষে কখনো ৫০০ টাকা, আবার কখনো ১ হাজার টাকা পাই। এই সামান্য আয় দিয়ে মা-বাবার খরচ চালাতেও হিমশিম খেতে হয়। তারপরও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করার চেষ্টা করি। পাহাড়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে কাজ করে যেতে চাই।’
বনপুর সাংগু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্লাস শেষে সংসার চালাতে তাঁদের কেউ গরুর খামারে কাজ করেন, আবার কেউ বাগানে শ্রম দেন।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অথোয়ই মারমার মতো শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদানে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর নিজের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও স্বল্প পারিশ্রমিকের বিষয়টি যেমন বাস্তবতা, তেমনি সেই বাস্তবতার মধ্যেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে যাওয়াও তাঁর পেশাগত দায়বদ্ধতার একটি দিক। তাঁর এই অভিজ্ঞতা দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে আসে।