বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
খাগড়াছড়িতে স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন ধলিয়াখালের ভাঙনরোধে ৫ প্রকল্প, শুরু হয়েছে প্রথমটির কাজ; এলাকাবাসীর স্বস্তি কাপ্তাইয়ের কৃতি সন্তান মোশাররফ অপু ওমান বিএনপির আল-ওয়েলজা শাখার সভাপতি নির্বাচিত বিলাইছড়িতে বিকাশে ভুল নম্বরে পাঠানো টাকা পুনরুদ্ধার করল পুলিশ খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর চক্ষু ক্যাম্পে সেবা পেলেন ৬০০ জন মাটিরাঙ্গায় ‘সম্প্রীতি কাপ’ ফুটবল শুরু: প্রথম ম্যাচ ড্র বাঙ্গালহালিয়াতে চন্দ্রঘোনা থানা পুলিশের উদ্যোগে মাদক বিরোধী র্যালী ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত গুইমারা থানার আয়োজনে হাফছড়িতে মাদক বিরোধী র্যালী ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত বাঘাইছড়িতে থানা পুলিশের উদ্যোগে মাদকবিরোধী র‍্যালি অনুষ্ঠিত কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে বিরল ধনেশ পাখির দেখা রাজস্থলীতে আশিকা’র প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত রাজস্থলীতে পুলিশের উদ্যোগে মাদকবিরোধী র‍্যালি ও সমাবেশ লক্ষ্মীছড়িতে সেনাবাহিনীর অভিযানে ১৬ লাখ টাকার গোলকাঠ ও বাঁশ জব্দ বাঘাইছড়িতে এসএসসি কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা বিলাইছড়িতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেড় হাজার পরিবার, নেই পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা র‌্যাব ১৫ এর অভিযানে ১ লাখ পিস ইয়াবা ও সিএনজিসহ চালক আটক

খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর চক্ষু ক্যাম্পে সেবা পেলেন ৬০০ জন

Reporter Name

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।।

দুই বছর ধরে চোখে ঝাপসা দেখেন তিনি। ধীরে ধীরে কমে আসছিল দৃষ্টিশক্তি। সংসারের কাজ থেকে শুরু করে স্বাভাবিক চলাফেরাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। অর্থের সংকট আর দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দূরে গিয়ে চিকিৎসা করানোও হয়ে ওঠেনি। অবশেষে পানছড়িতে বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে এসে জানতে পারলেন—চোখে ছানি পড়েছে। শুধু রোগ শনাক্তই নয়, বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের আশ্বাসও পেলেন তিনি।

তার মতো আরও শত শত মানুষের চোখে তখন নতুন আশার আলো।

পাহাড়ের দুর্গম জনপদে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা যখন অনেকের নাগালের বাইরে, তখন খাগড়াছড়ির পানছড়িতে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হলো বিনামূল্যের বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা। খাগড়াছড়ি সদর সেনা জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে এবং রোটারি ক্লাব ও চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় আয়োজিত দিনব্যাপী এই চক্ষু ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন প্রায় ৬০০ নারী-পুরুষ। এর মধ্যে ৭০ জনের বেশি ছানি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছানি অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বুধবার সকালে পানছড়ি মডেল মসজিদ কমপ্লেক্সে শুরু হয় এই চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প। পানছড়ি ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে সকাল থেকেই মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্প প্রাঙ্গণ।

কেউ এসেছেন চোখে ঝাপসা দেখা নিয়ে, কেউ দীর্ঘদিনের চোখের ব্যথা কিংবা দৃষ্টিজনিত জটিলতা নিয়ে। আবার বয়সের ভারে চোখের আলো কমে যাওয়া প্রবীণদেরও দেখা গেছে চিকিৎসকদের কাছে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে।

চিকিৎসকেরা রোগীদের চোখ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেন। অনেকেই প্রথমবারের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে চোখ পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান। কারও দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ, আবার যাদের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন তাদের দেওয়া হয় পরবর্তী চিকিৎসার দিকনির্দেশনা।

ক্যাম্পে আসা এক ছানি রোগীর মুখে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বস্তির ছাপ। তিনি বলেন, “দুই বছর ধরে আমি চোখে ঠিকমতো দেখতে পারি না। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছেন ছানি হয়েছে। অপারেশনও বিনামূল্যে করে দেবে শুনে খুব ভালো লাগছে। সেনাবাহিনীর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।”

আরেক উপকারভোগী বলেন, “অনেকদিন ধরে চোখের সমস্যা ছিল। দূরে গিয়ে ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয়নি। এখানে এসে বিনামূল্যে ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। এতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে।”

পানছড়ি ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য এমন চিকিৎসা ক্যাম্প যেন একসঙ্গে দুটি সংকটের সমাধান করেছে—চিকিৎসার খরচ এবং দূরত্বের বাধা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে যেখানে অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, সেখানে নিজ এলাকায় এসে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে রোগীদের মধ্যে।

শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা নয়, এই ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ছানি রোগীদের বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ। শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে অপারেশনের ব্যবস্থা করা হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কায় থাকা অনেক মানুষের সামনে খুলেছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নতুন দরজা।

ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন পানছড়ি সাবজোন কমান্ডার মেজর মাহমুদ ও সাবজোন উপ-অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আশিকসহ সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা। তারা চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্যাম্পের সার্বিক কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন।

পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দুর্গমতা বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক, দূরবর্তী বসতি এবং সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। বিশেষ করে চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের রোগ দীর্ঘদিন অবহেলায় রাখলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

এই বাস্তবতায় পানছড়ির চক্ষু ক্যাম্পকে শুধু একটি দিনের চিকিৎসা কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। তাদের কাছে এটি চিকিৎসার পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশার একটি দরজা।

 

চট্টগ্রাম লায়ন্স আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডা. শুভ চক্রবর্তী বলেন, পুরো মেডিকেল টিম নিয়ে তারা ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন ধরনের রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। বিশেষ করে এখন পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি ছানি রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের চট্টগ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বিনামূল্যে ছানি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হবে।

খাগড়াছড়ি সদর জোনের মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন তানজিম ইসলাম অর্ণব বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, খাগড়াছড়ি জোনের ব্যবস্থাপনায় এবং চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় পানছড়িতে এই বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।

 

খাগড়াছড়ি সদর জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুর রহমান বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন কার্যক্রমে গিয়ে তারা দেখেছেন, অনেক মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগছেন এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও রিজিয়ন হেডকোয়ার্টারের উদ্যোগে এবং লায়ন্স ক্লাব চিটাগংয়ের সহযোগিতায় এই চক্ষু শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আজ প্রায় ৬০০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ছানিসহ জটিল রোগীদের চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

এক দিনের এই ক্যাম্প শেষ হবে, চিকিৎসকরাও ফিরে যাবেন। কিন্তু যাদের চোখে নতুন করে আলো ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাদের কাছে এই দিনটি থেকে যাবে দীর্ঘদিন।

পাহাড়ের নীরব জনপদে চিকিৎসাসেবার এমন উদ্যোগ তাই কেবল রোগ নিরাময়ের আয়োজন নয়—এটি মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার, অন্ধকার সরিয়ে আলোর পথ দেখানোর এক মানবিক প্রয়াস। চোখের চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় ৬০০ মানুষের ভিড়ে সেই প্রত্যাশার ছবিটিই যেন সবচেয়ে স্পষ্ট—আবারও স্বাভাবিকভাবে দেখতে চান তারা, ফিরতে চান আলোয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *