শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ৫৭ রোগীকে বিনামূল্যে চক্ষু সেবা দীঘিনালায় অতিরিক্ত মজুদের অভিযোগে ২১ টন সার জব্দ বাল্যবিয়ের শিকার থেকে নির্যাতিত নারী-শিশুর পাশে সাজেদা রাজস্থলীতে গর্ভবতী নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যেতে হবে: পার্বত্য মন্ত্রী কাপ্তাইয়ে বিজিবির অভিযানে ২৮ লাখ টাকা জব্দ, আটক ২ খাগড়াছড়িতে বন্যা-ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ পরিবার পেল নগদ আর্থিক সহায়তা খাগড়াছড়িতে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি বন্ধে জেলা অ্যাডভোকেসি সভা বিদায়ের মঞ্চে অশ্রুসিক্ত মহালছড়ির শিক্ষকরা, সম্মান জানাল প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদানে বাঘাইছড়িতে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত দীঘিনালায় বন্যাদুর্গত ২৫০ পরিবারকে রেড ক্রিসেন্টের খাদ্য সহায়তা বাঘাইছড়ি এ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্কুলে বিজ্ঞান ল্যাব ও লাইব্রেরি উদ্বোধন অসহায় বৃদ্ধার পাশে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদল নেতা বান্দরবানে এসএসসি উত্তীর্ণ ১৬৮ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা লক্ষ্মীছড়িতে লজ্জাবতী বানর উদ্ধার দুর্গম পাহাড়ের ৬১ ছানি রোগীর চোখে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলো

বাল্যবিয়ের শিকার থেকে নির্যাতিত নারী-শিশুর পাশে সাজেদা

Reporter Name

মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি।।
মাত্র ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সাজেদা পারভীন সাজুর। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাল্যবিয়ের কারণে পড়াশোনা থেমে যাওয়ার কথা থাকলেও সংসারের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তী সময়ে স্বামীর নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়ে সংসার ভেঙে গেলে নিজের তিন সন্তানকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নির্যাতিত নারী ও শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

৪৭ বছর বয়সী সাজেদা পারভীন বর্তমানে বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা হিমছড়ি এলাকায় দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি মৃত হাজী মোস্তাক আহমেদ ও মৃত রাবেয়া খাতুনের মেয়ে।

সাজেদা জানান, ১৯৯১ সালে চকরিয়ার দিগরপানখালী উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে সংসারজীবন শুরু করেন। সংসার ও পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে ১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল। এরপর স্বামী অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে তার অভিযোগ। এ সময় তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে।

সাজেদা বলেন, ওই সময় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন, নির্যাতনের শিকার একজন নারী কতটা অসহায় হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই নির্যাতিত নারী ও শিশুর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সংসারের পাশাপাশি এ কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এলাকায় তিনি ‘সাজু আপা’ ও ‘মানবাধিকার সাজু’ নামে পরিচিত।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় তিনি সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। এর মধ্যে তিনটি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নির্যাতনের শিকার ৩০ নারীকে সংসারে ফিরিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন। আরও ২০টি মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

সাজেদা বলেন, “আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনায় অনেক সময় দায় নারীর ওপরই চাপানো হয়। লোকলজ্জা ও ভয়ের কারণে অনেকে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে একজন নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মানসিকভাবে শক্তি দেওয়াই আমার প্রথম কাজ। বিষয়টি আপসযোগ্য হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করি। আর গুরুতর ঘটনা হলে ভুক্তভোগী কোথায় ও কীভাবে আইনি সহায়তা পাবেন, সে বিষয়ে পরামর্শ দিই।”

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে হাসপাতাল ও থানায় যান। সরকারি হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং থানার নারী ও শিশু সেবা সেলগুলো আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডিএনএ পরীক্ষার ক্ষেত্রে যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচের জন্য সরকারি সহায়তা থাকা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়ও ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়িয়েছেন সাজেদা। গত ১২ সেপ্টেম্বর ইয়াংছা এলাকার এক তরুণীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লামা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণঝিরি এলাকার এক তরুণ ছয় মাস ধরে বিভিন্ন স্থানে রেখে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ওই তরুণীকে বিয়ে করতে তরুণ ও তার পরিবার অনীহা প্রকাশ করলে সাজেদা ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই তরুণের বাড়িতে যান। সেখানে সমাধান না হওয়ায় ওই দিন বিকেলে লামা থানায় আইনি সহায়তা চেয়ে অভিযোগ করা হয়।

নারী ও শিশু নির্যাতনের কয়েকটি আলোচিত ঘটনাতেও তিনি কাজ করেছেন বলে জানান সাজেদা। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ছয় বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার ধর্ষণ, ২০১৪ সালে হাইদারনাশী এলাকায় স্বামীর হাতে পারভীন আক্তারের নির্যাতন, ২০১৬ সালে বনপুর এলাকায় সালমা আক্তার ধর্ষণ, ২০১৮ সালে জাহেদা বেগম ধর্ষণ এবং ২০২৫ সালে মহিমা আক্তার ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করেন তিনি। এসব মামলার কয়েকটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি। কোনো কোনো মামলায় আসামিরা কারাগারে রয়েছেন বলেও জানান সাজেদা।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার, নারী ও পুরুষের সমঅধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, শিক্ষাক্রমে জেন্ডার সমতা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

সাজেদা পারভীন বলেন, “নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সহিংসতামুক্ত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই আমার প্রত্যাশা। পৃথিবীটা হোক সব মানুষের।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *