
॥দেবদত্ত মুৎসুদ্দী , রাঙ্গামাটি॥
রাঙ্গামাটির জেলার যোগাযোগ ও পর্যটন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ২৯৪ মিটার দীর্ঘ আসামবস্তি-কাপ্তাই সেতু। দীর্ঘদিন ধরে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর বন্যায় সেতুটির পিলারের কংক্রিট খসে পড়ে রড বেরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। সম্পূর্ণ নতুন করে এই সেতু নির্মাণ করতে হলে সরকারের ব্যয় হতো ৮০ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে আধুনিক নতুন প্রযুক্তি মাধ্যমে রেট্রোফিটিং পদ্ধতিতে সেতুটি সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৮০লাখ টাকা।
এই বিশাল ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এগিয়ে আসে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাঙ্গামাটি কার্যালয়। তারা ‘রেট্রোফিটিং’ নামের একটি আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির মাধ্যমে মেরামতের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পদ্ধতিতে সেতুর ভার মূল পিলারের উপর না রেখে, তা লোহার কাঠামোর ওপর সরিয়ে কংক্রিট ও রড যুক্ত করে শক্তিশালী করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাঙ্গামাটি কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, অভিনব এই রেট্রোফিটিং পদ্ধতিতে কাজ সম্পন্ন করতে খরচ হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। নতুন সেতু বানানোর জন্য যেখানে প্রায় ৮০ কোটি টাকা লাগতো, সেখানে এতো অল্প খরচে মূল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। সংস্কারের ফলে সেতুর স্থায়িত্ব আরও ৩০ থেকে ৪০ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০০৬ সালে রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার দূরত্ব কমিয়ে আনতে তৎকালীন সরকার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ২৯৪ মিটার দৈর্ঘ্যর বিশাল সেতু নির্মাণ করেছিলো। দীর্ঘ দু’দশক পর সেতুটির পিলারসহ অবকাঠামো দুর্বল হতে থাকে। পরে রাঙ্গামাটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে রেট্রোফিটিং পদ্ধতিতে সেতুটির কাজ শুরু করে। বর্তমানে সেতুর কাজ শেষের পথে।
স্থানীয়রা জানান, আসামবস্তি-কাপ্তাই সেতুটি রাঙ্গামাটি জেলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন নিত্য পণ্য নিয়ে রাঙ্গামাটি থেকে কাপ্তাই উপজেলায় ভারী যানবাহন চলাচল করে। তারা আরও জানান, আগে সেতুতে কোনো ভারী যানবাহন উঠলে সেতুর কম্পন সৃষ্টি হতো। বর্তমানে সেতুটি সংস্কার হওয়ার পরে এই কম্পন অনেকটাই কমে এসেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা প্রকৌশলী প্রণব রায় চৌধুরী জানান, সেতুটির উঁচু পিলারের ‘স্টিচিং’ (পিলারে ফাটল মেরামত) করা আমাদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিলো। মূলত সেতুটির ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নে যে সময়টুকু ব্যয় হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সেতুর পিলারের ‘স্টিচিং’ করা। তাই রেট্রোফিটিং পদ্ধতিতে সেতুর পিলার গুলো ‘স্টিচিং’ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পুরো বছর বেশিরভাগ সময় সেতুটির পিলারগুলো কাপ্তাই হ্রদের পানিতে তলিয়ে থাকে। বছরের দুই থেকে তিন মাস কাজ করতে পারি। সেই সময়ের মধ্যে রাত-দিন দ্রুত কাজ করা হয়েছে। আশাকরি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাঙ্গামাটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ শফি জানান, সেতুটির উপর প্রতিদিন ভারি যানবাহন বা ওভারলোড গাড়ি চলাচল করায় সেতুটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাতে এবং দীর্ঘ নয় মাস পানিতে ডুবে থাকার কারণে পিলারের কংক্রিট খসে পড়ে এবং পিলারের বিভিন্ন স্থানে রড বের হয়ে গেছে। তাই আমরা সেতুটি মেরামত করার উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি আরও জানান, সেতুটি ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হলে সরকারের ব্যয় হতো ৮০ থেকে ৯০ কোটি। এছাড়াও সেতু নির্মাণকালীন সময় ব্যয় ও যোগাযোগ ভোগান্তি সৃষ্টি হতো। বর্তমানে রেট্রোফিটিং করায় সেতুটি ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত টেকসই হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে সেতুটি ব্রাজিল সেতু নামে পরিচিত। এই সেতুটিতে প্রতিদিন স্থানীয় পর্যটকদের আগমন ঘটে। এছাড়াও বাইরে পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে এই সেতু।