
দেবদত্ত মুৎসুদ্দী, রাঙামাটি প্রতিনিধি।।
পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিতব্য দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল স্টেইড সেতু। রাঙামাটি-বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা-রাইখালী সড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ৫২৩ মিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণ হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘ চার দশকের ফেরিনির্ভর যাতায়াতের অবসান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেতুটি চালু হলে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কর্ণফুলী নদীর চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাট ১৯৮৪ সাল থেকে রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তবে দীর্ঘদিন ধরে ফেরিতে পারাপারের জন্য অপেক্ষা, বর্ষা মৌসুমে নৌ চলাচলে অনিশ্চয়তা এবং জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভোগান্তি ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনেক সময় বিকল্প হিসেবে ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌযানেও নদী পার হতে হয় স্থানীয়দের।
এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে চন্দ্রঘোনা-রাইখালী সড়কে কর্ণফুলী নদীর ওপর আধুনিক প্রযুক্তির ক্যাবল স্টেইড সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকৌশলগত দিক থেকে ক্যাবল স্টেইড সেতু একটি আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামো। এ ধরনের সেতুতে মূল পিলার থেকে শক্তিশালী ইস্পাতের ক্যাবলের মাধ্যমে সেতুর ডেক বা মূল কাঠামো ধারণ করা হয়। এতে নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা বজায় রেখে দীর্ঘ স্প্যানের সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হয়। প্রস্তাবিত সেতুতে আধুনিক টোল প্লাজা এবং সেতুর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
সেতুটি চালু হলে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ, নিরাপদ ও দ্রুত হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য তিন পার্বত্য জেলা থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে যাতায়াতেও সুবিধা বাড়বে।
চন্দ্রঘোনা এলাকার বাসিন্দা সুমন বলেন, “সেতুটি নির্মাণ হলে রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সহজ হবে। ফেরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ভোগান্তি কমবে।”
বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা-রাইখালী সড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেল আরোহী মিন্টু চাকমা বলেন, “বর্ষা মৌসুমে কর্ণফুলী নদীর স্রোত বেড়ে গেলে ফেরিতে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দ্রুত সেতু নির্মাণ হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”
নিয়মিত এই পথে যাতায়াতকারী বাসযাত্রী মো. মান্নান বলেন, “চন্দ্রঘোনায় সেতু না থাকায় ফেরিতে পারাপারের জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। সেতু নির্মাণ হলে যাতায়াত আরও সহজ ও দ্রুত হবে।”
রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইং সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল স্টেইড সেতুর প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৫২৩ মিটার। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে নির্মাণকাজ শুরু হবে। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কর্ণফুলীর ওপর এই সেতু শুধু দীর্ঘদিনের ফেরি দুর্ভোগই দূর করবে না, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন, কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ।