
সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বিলাইছড়ি প্রতিনিধি।।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় দুর্গম ও প্রতিকূল পরিবেশে কৃষি তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। প্রবল বৃষ্টি, পাহাড়ি ছড়ার স্রোত, পিচ্ছিল ও দুর্গম পথ, যানবাহনের সংকট এবং অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি লজিস্টিক সহায়তা ও অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। কাঁধে ব্যাগ, হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও মোবাইল ফোন নিয়ে অনেক সময় দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে কৃষকের বাড়িতে যেতে হচ্ছে তাদের। কোনো কোনো এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড়ি এলাকায়ও যেতে হচ্ছে তথ্য সংগ্রহের জন্য।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমতলের তুলনায় পার্বত্য এলাকায় কৃষি জরিপের ধরন ও বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। কোথাও নৌকায়, কোথাও মোটরসাইকেলে আবার কোথাও দীর্ঘ পথ হেঁটে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হয়। বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়ার পানি বৃদ্ধি, কাদা ও পিচ্ছিল পথের পাশাপাশি পাহাড়ধস, দুর্ঘটনা এবং বন্য প্রাণীর ঝুঁকিও থাকে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় তথ্য আদান-প্রদানেও সমস্যায় পড়তে হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা তাদের সরকারি দায়িত্ব। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই কৃষি প্রণোদনা, ভর্তুকি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা এবং কৃষি খাতের বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। ফলে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা নিয়মিত মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবহন, জ্বালানি, নৌযান ভাড়া, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচের পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে মাঠপর্যায়ের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বর্তমানে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ব্লকের কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লকের পাশাপাশি উপজেলার অন্যান্য দুর্গম এলাকার কৃষকদের তথ্য সংগ্রহে যেতে হলে সময়, শ্রম ও যাতায়াত ব্যয়—তিনটিই বেড়ে যায়। এতে নিয়মিত দাপ্তরিক ও মাঠপর্যায়ের অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
কৃষি কর্মকর্তা রাজেশ প্রসাদ রায় ও ওমর ফারুক বলেন, নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়মিত দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। তবে সমতলের তুলনায় পাহাড়ে কৃষি তথ্য সংগ্রহের কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চ্যালেঞ্জিং। অনেক সময় কৃষকদের একই সময়ে বাড়িতে পাওয়া যায় না। একজন থাকলে অন্যজন থাকেন না। স্বামী-স্ত্রী দুজনের তথ্যের প্রয়োজন হলে পৃথক সময়ে একাধিকবার বাড়িতে যেতে হয়। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি ব্যয় হয়।
তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে যদি নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লকের কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তিনি ওই এলাকার কৃষকদের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে জানবেন। এতে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় বারবার যাতায়াতের ঝুঁকিও কমবে এবং মাঠপর্যায়ের অন্যান্য কৃষি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সহজ হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, দুর্গম এলাকার কৃষকদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবার মতামতের ভিত্তিতে সুবিধাজনক কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কৃষকদের উপস্থিত করে তথ্য নেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে কৃষক ও কর্মকর্তাদের উভয়েরই সুবিধা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতেই কৃষি খাতের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের জন্য পর্যাপ্ত যাতায়াত সুবিধা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হলে মাঠপর্যায়ের কৃষি তথ্য সংগ্রহ আরও কার্যকর ও গতিশীল হবে।