
দুর্গম পাহাড়ি পথ, আঁকাবাঁকা স্বচ্ছ জলের ঝিঁড়িপথ, শতবর্ষী প্রাচীন বৃক্ষ আর সবুজে মোড়া পাহাড়—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বিলাইছড়ি উপজেলা। বম, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া ও বাঙালিসহ প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস এ জনপদে। কিন্তু এই বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে শিশুদের এক গভীর বঞ্চনা—বিনোদনের চরম অভাব।
তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলার একটি বিলাইছড়ি। জেলা সদরে সীমিত কিছু বিনোদন ব্যবস্থা থাকলেও উপজেলাগুলোতে তা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষ করে বিলাইছড়িতে শিশুদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। জীবিকার তাগিদে এখানকার মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়—জুমচাষ, মাছ ধরা কিংবা পাহাড়ের ঢালে চাষাবাদই প্রধান জীবিকা। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও সীমিত।
উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মিলিয়ে ৬০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি কলেজ থাকলেও বিদ্যালয়ভিত্তিক শিশু বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। উপজেলা সদরে একটি নীলাদ্রি রিসোর্ট ও ছোট শিশু পার্ক থাকলেও তা বিদ্যালয়কেন্দ্রিক নয়। অধিকাংশ বিদ্যালয়ের ইনডোরে ছোটখাটো মাঠ থাকলেও দোলনা, স্লাইডার, শিশু পার্ক বা খেলাধুলার উপকরণ অনুপস্থিত। আউটডোর বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিলাইছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাজগুরু অগ্রবংশ উচ্চ বিদ্যালয়, ফারুয়া উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, তক্তানালা ও কেংড়াছড়ি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাঠ থাকলেও শিশু বিনোদনের উপকরণ নেই। আবার কেংড়াছড়ি, কেরনছড়ি, ম্রাংছড়া, ডাউনপাড়া, জান্দিমোন, পাংখোয়া পাড়া, চাইন্দা পাড়া, গাছকাটাছড়া, ওড়াছড়ি, ফারুয়া, আমকাটা ছড়া, গবছড়ি ও কুতুবদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাঠের ব্যবস্থাই নেই। হ্রদের পানি শুকালেও পলি ও জমিতে খেলাধুলা করা যায় না। অধিকাংশ পরিবারে টিভি, ফ্রিজ কিংবা নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থাও নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অনেকের অভিযোগ, প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে আত্মীয়তা ও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, অনিয়মিত ক্লাস এবং পরিকল্পনার অভাব গুণগত শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে বিদায়ী ইউএনও মুহাম্মদ মামুনুল হক বলেন, পাহাড়ে শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি গুরুতর। তাঁর উদ্যোগে ১০টি থেকে ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল্ক’ চালুর পরিকল্পনা থাকলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি।
বিলাইছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, নিয়মিত খেলাধুলার জন্য স্লাইডার, দোলনা, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, শিশুতোষ খেলনা ও ভারসাম্য স্কেটের মতো উপকরণ জরুরি।
বিলাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি দেওয়ান ও ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, উপজেলায় কোনো বিদ্যালয়ে শিশু বিনোদন কেন্দ্র নেই। পরিকল্পিতভাবে বিদ্যালয়গুলোতে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুললে শিশুদের উপকার হবে। এ জন্য পার্বত্য ও প্রধান উপদেষ্টার সুদৃষ্টি প্রয়োজন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিরালা কান্তি চাকমা বলেন, “গুণগত শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিনোদনের সুযোগ ও ডিজিটাল লার্নিং। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।”
স্থানীয় গবেষকদের মতে, পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও বিনোদনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এখান থেকেই উঠে আসতে পারে নতুন প্রজন্মের মেধাবীরা। তখন বিশ্ব দেখবে চিরসবুজ পাহাড় আর স্বপ্নে ভরা শিশুদের চোখে নতুন দিনের ঝিলিক। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাবে সেই স্বপ্ন আজও অধরা। তাই সময়ের দাবি—শিক্ষার পাশাপাশি পাহাড়ি শিশুদের জন্য টেকসই বিনোদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।