
সোয়েব সাঈদ, রামু প্রতিনিধি।।
কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলা-অগ্নিসংযোগের ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধবিহার ও বসতঘর পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও অনেকটা ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে পুনর্নির্মিত বিহারগুলোতে বেড়েছে পূণ্যার্থী ও পর্যটকের আনাগোনা। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন আয়োজনে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণও দেখা যায়।
তবে ঘটনার পর দায়ের করা মামলাগুলোর বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে মামলার আসামিদের অনেকে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে পুলিশের দায়ের করা কয়েকটি মামলায় নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগও রয়েছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে রামুতে বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরদিন উখিয়া ও টেকনাফেও একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৯টি বৌদ্ধবিহার ও ৪১টি বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য। আরও কয়েকটি বিহার ও অর্ধশতাধিক বসতঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। আগুনে পুড়ে যায় বৌদ্ধবিহারে সংরক্ষিত বহু পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
ঘটনার পর সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও বসতঘর পুনর্নির্মাণ করে দেয়। বর্তমানে রামুর বিভিন্ন বিহার নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধর্মীয় উৎসব ও বিভিন্ন আয়োজনে স্থানীয়দের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন বলছেন, সহিংসতার ক্ষত অনেকটাই কাটিয়ে উঠলেও মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা তাদের উদ্বেগের কারণ। তাদের মতে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ করা জরুরি।
ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সদস্য অ্যাডভোকেট সুমথ বড়ুয়া বলেন, ঘটনার পর দায়ের করা মামলাগুলোতে অনেক নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে স্বাধীন তদন্ত বা কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের পরিচালক শীলপ্রিয় থের বলেন, সেই রাতের ঘটনা এখনও মনে পড়লে কষ্ট হয়। অনেক মূল্যবান সম্পদ ও ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। তবে বর্তমানে রামুতে আগের তুলনায় সম্প্রীতি বেড়েছে। ভবিষ্যতেও এ সম্প্রীতি ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ১৪ বছরে রামুর বৌদ্ধরা অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। নতুন করে নির্মিত বিহারগুলো এখন পূণ্যার্থী ও পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। তবে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। রামুর আটটি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। একটি মামলা পরবর্তীতে আপস-মীমাংসার ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রামু ও উখিয়া-টেকনাফের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর অধিকাংশের বিচার এখনও শেষ হয়নি।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, কয়েকটি মামলায় সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে অনেক মামলায় সাক্ষীরা এখনো সাক্ষ্য দিতে আসেননি। সাক্ষীরা যথাযথভাবে সাক্ষ্য দিলে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হবে।
এদিকে, ২০১২ সালের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে আলোচিত উত্তম বড়ুয়া বর্তমানে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে ছবিটির সত্যতা ও তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
১৪ বছর পর রামুর বৌদ্ধপল্লিতে ফিরেছে স্বাভাবিকতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ। তবে মামলাগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধের প্রত্যাশা স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের।