বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
রাজস্থলীতে নজরুল বর্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণ  বাঘাইহাটে সেনা জোনের উদ্যোগে নিরাপত্তা সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত আগরতলায় বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার, দুই সহযোগী পলাতক বাঘাইছড়িতে দুই শতাধিক ছাগল-ভেড়াকে পিপিআর টিকা কার্যক্রম শুরু লামায় অবৈধ ইটভাটায় অভিযান, ১৩ মামলায় ২৯ লাখ টাকা জরিমানা দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে প্রথম নারী চিকিৎসক সংচাং ম্রো পার্বত্য চট্টগ্রাম টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান স্বপন কুমার চাকমা কাপ্তাইয়ের বীর কুমার তনচংগ্যার অনন্য কীর্তি, এভারেস্টের তিন উচ্চতম পাস সাইকেলে জয় রাঙামাটিকে পর্যটনের হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া দ্বারিকোপ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি মাহবুব আলম রাঙামাটিতে নানা আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত বরকলে জুমচাষে হলুদের বাম্পার ফলনের আশা দীঘিনালায় বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক সম্মাননা পেলেন খাগড়াছড়ির চম্পানন চাকমা থানচির তিন্দুতে চাঁদের গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত ২, আহত ৫ রাজস্থলীতে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে র্যালী ও আলোচনা সভা

দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে প্রথম নারী চিকিৎসক সংচাং ম্রো

Reporter Name

মো. ইসমাইলুল করিম, লামা প্রতিনিধি।।
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ম্রো জনগোষ্ঠীর পরিবার থেকে উঠে এসে চিকিৎসক হয়েছেন সংচাং ম্রো। নানা প্রতিকূলতা, আর্থিক সংকট ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিবারের সহযোগিতায় তিনি পূরণ করেছেন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে তার এই অর্জন পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

সংচাং ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইয়া কারবারি পাড়ায়। তার বাবা কাইংপ্রে ম্রো ও মা তুমলেং ম্রো। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের অভাব-অনটন এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। চিকিৎসার অভাবে এক বোনের মৃত্যু এবং মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।

সংচাংয়ের পড়াশোনার শুরু বাবার হাত ধরে। জুমচাষের কাজের ফাঁকে বাবা কখনো মাটিতে, কখনো কলাপাতায় অক্ষর লিখে তাকে পড়াতেন। গ্রামে বিদ্যালয় না থাকায় মেয়ের পড়াশোনার জন্য কাইংপ্রে ম্রো তাকে লামা মিশন হোস্টেলে ভর্তি করান। পরে ওই হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেলে ফাদার লুপির পরিচালিত তৈদাং হোস্টেলে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে চম্পটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন সংচাং। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পান তিনি।

আলীকদমে বিজ্ঞানের উপযুক্ত শিক্ষক না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে সেন্ট যোসেফস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে যেতে হয়। আর্থিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষক, শিক্ষিকা ও সিস্টারদের সহযোগিতায় তার পড়াশোনা এগিয়ে চলে।

এসএসসি পাসের পর হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে শুরুতে ভর্তি হতে পারেননি সংচাং। পরে নমিতা সিস্টারের সহযোগিতায় সেখানে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পান। কলেজের কয়েকজন শিক্ষকও তাকে বিনা মূল্যে পড়িয়েছেন। মেরি মার্গারেট সিস্টার তাকে মাঝেমধ্যে হাতখরচও দিতেন।

এইচএসসি পরীক্ষার পরও আর্থিক সংকট ছিল। বাসায় ফিরে না গিয়ে কলেজে থেকেই দুই ভাই-বোনকে পড়িয়ে উপার্জিত অর্থে মেডিকেল ভর্তির প্রস্তুতি নেন তিনি। বাবা তাকে বাড়ি ফিরে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিলেও চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন সংচাং।

শেষ পর্যন্ত রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ব্যাচে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে ফিরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় তার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ওই কলেজেই ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংচাং ম্রো।

মেডিকেলে ভর্তির পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা, সুবর্ণা ভূমি ফাউন্ডেশন, বিএসএসবির কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাকে সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি সিনিয়র ভাই-বোনেরা বই-খাতা ও বৃত্তি দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।

আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি ম্রো কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক থং প্রে ম্রো বলেন, সংচাং ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম নারী চিকিৎসক। তার এ অর্জন ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণার।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ হাজার। জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসের কারণে এ জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের কাছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনো সহজলভ্য নয়।

নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে সংচাং ম্রো চান, পাহাড়ের মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে আর প্রাণ না হারায়। দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য উন্নত ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এখন তার অন্যতম লক্ষ্য। তার এই পথচলা দেখিয়েছে, প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে দুর্গম পাহাড়ের মেয়েরাও উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *