
সংচাং ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইয়া কারবারি পাড়ায়। তার বাবা কাইংপ্রে ম্রো ও মা তুমলেং ম্রো। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের অভাব-অনটন এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। চিকিৎসার অভাবে এক বোনের মৃত্যু এবং মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।
সংচাংয়ের পড়াশোনার শুরু বাবার হাত ধরে। জুমচাষের কাজের ফাঁকে বাবা কখনো মাটিতে, কখনো কলাপাতায় অক্ষর লিখে তাকে পড়াতেন। গ্রামে বিদ্যালয় না থাকায় মেয়ের পড়াশোনার জন্য কাইংপ্রে ম্রো তাকে লামা মিশন হোস্টেলে ভর্তি করান। পরে ওই হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেলে ফাদার লুপির পরিচালিত তৈদাং হোস্টেলে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে চম্পটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন সংচাং। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পান তিনি।
আলীকদমে বিজ্ঞানের উপযুক্ত শিক্ষক না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে সেন্ট যোসেফস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে যেতে হয়। আর্থিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষক, শিক্ষিকা ও সিস্টারদের সহযোগিতায় তার পড়াশোনা এগিয়ে চলে।
এসএসসি পাসের পর হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে শুরুতে ভর্তি হতে পারেননি সংচাং। পরে নমিতা সিস্টারের সহযোগিতায় সেখানে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পান। কলেজের কয়েকজন শিক্ষকও তাকে বিনা মূল্যে পড়িয়েছেন। মেরি মার্গারেট সিস্টার তাকে মাঝেমধ্যে হাতখরচও দিতেন।
এইচএসসি পরীক্ষার পরও আর্থিক সংকট ছিল। বাসায় ফিরে না গিয়ে কলেজে থেকেই দুই ভাই-বোনকে পড়িয়ে উপার্জিত অর্থে মেডিকেল ভর্তির প্রস্তুতি নেন তিনি। বাবা তাকে বাড়ি ফিরে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিলেও চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন সংচাং।
শেষ পর্যন্ত রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ব্যাচে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে ফিরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় তার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ওই কলেজেই ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংচাং ম্রো।
মেডিকেলে ভর্তির পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা, সুবর্ণা ভূমি ফাউন্ডেশন, বিএসএসবির কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাকে সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি সিনিয়র ভাই-বোনেরা বই-খাতা ও বৃত্তি দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি ম্রো কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক থং প্রে ম্রো বলেন, সংচাং ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম নারী চিকিৎসক। তার এ অর্জন ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণার।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ হাজার। জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসের কারণে এ জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের কাছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনো সহজলভ্য নয়।
নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে সংচাং ম্রো চান, পাহাড়ের মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে আর প্রাণ না হারায়। দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য উন্নত ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এখন তার অন্যতম লক্ষ্য। তার এই পথচলা দেখিয়েছে, প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে দুর্গম পাহাড়ের মেয়েরাও উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারেন।