
দেবদত্ত মুৎসুদ্দী, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি।
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির উঁচু-নিচু পাহাড় আর ঝরনার কোল ঘেঁষে এখন আমড়ার মৌসুম। পাহাড়ের বাড়ির আঙিনা, বাগান ও জুমসংলগ্ন জমিতে ঝুলছে টক-মিষ্টি স্বাদের আমড়া। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু একটি ফল নয়; মৌসুমি আয়, খাদ্যাভ্যাস ও স্থানীয় ঐতিহ্যেরও অংশ।
রাঙ্গামাটির লালচে মাটি ও আর্দ্র আবহাওয়া আমড়া চাষের জন্য বেশ উপযোগী। জেলায় মূলত দেশি জাতের আমড়ার চাষ হয়। গাছের জন্য অতিরিক্ত পরিচর্যার প্রয়োজন না হওয়ায় বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে কিংবা পতিত জমিতেও আমড়ার গাছ দেখা যায়। ভাদ্র-আশ্বিনে গাছে ফলন আসে। কাঁচা আমড়া সবুজ এবং পরিপক্ব হলে হালকা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। টক স্বাদের পাশাপাশি এর রয়েছে স্বতন্ত্র সুগন্ধ।
রাঙ্গামাটির পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় আমড়ার রয়েছে আলাদা জায়গা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষও আমড়া কাঁচা, ভর্তা, আচার ও চাটনি হিসেবে খেয়ে থাকেন। স্থানীয়দের অনেকের ধারণা, গরমের সময়ে আমড়া খেলে শরীর সতেজ থাকে।
মৌসুমে রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার, বনরূপা বাজারসহ বিভিন্ন উপজেলা ও স্থানীয় হাটে আমড়ার সরবরাহ বেড়ে যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি আমড়া ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয় বিক্রেতারা জানান। পাহাড়ের অনেক নারী ডালা ও টুকরিতে করে আমড়া বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। এতে মৌসুমি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
শুধু তাজা ফল হিসেবে নয়, আমড়াকে ঘিরে গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনাও। আমড়ার আচার, চাটনি, জুস ও মোরব্বার চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ আমড়ার তৈরি বিভিন্ন পণ্য অনলাইনে বিক্রি করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও এসব পণ্যের অর্ডার আসে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে আমড়াকে ঘিরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
আমড়া পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি ফল। এতে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে এর পুষ্টিগুণ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর মতো স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত দাবিগুলো নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচার না করে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ অনুসরণ করাই প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে কাঁচা আমড়া লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়ার পাশাপাশি পাকা আমড়া দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আচার ও মোরব্বা তৈরি করা হয়। গ্রামীণ পর্যায়ে আমড়ার পাতা ও বাকল ভেষজ ব্যবহারের কথাও প্রচলিত রয়েছে।
তবে সম্ভাবনা থাকলেও আমড়া চাষিরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমে উৎপাদিত আমড়ার একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধতা থাকায় মৌসুমভেদে দামের ওঠানামাও দেখা যায়। এ অবস্থায় সংরক্ষণাগার, পরিবহনব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো গেলে চাষিরা আরও ভালো দাম পেতে পারেন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, রাঙ্গামাটিতে প্রায় ২৪ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হচ্ছে। বছরে উৎপাদন প্রায় ২৪০ মেট্রিক টন এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। স্থানীয় বাজারে আমড়ার মোটামুটি চাহিদা রয়েছে। কৃষি বিভাগ উন্নত জাতের চারা রোপণ ও চাষাবাদ বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, শুধু আমড়া নয়, পাহাড়ের বিভিন্ন ফলের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এ জন্য ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে উৎপাদিত ফলের অপচয় কমার পাশাপাশি কৃষক ও উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে রাঙ্গামাটির আমড়া দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমড়া বিক্রেতা জানকি রাখাইন বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আমড়াকে ‘রাঙ্গামাটির ব্র্যান্ড ফল’ হিসেবে পরিচিত করা গেলে পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। আমড়া শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ের মানুষের জীবনযাপন, পরিশ্রম ও স্থানীয় ঐতিহ্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে আমড়া চাষ সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, উৎপাদন-পরবর্তী সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে রাঙ্গামাটির আমড়া স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী ফলটি নিজস্ব পরিচিতি নিয়ে দেশের বাজারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।